আপিল শুনানি শুরু

পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আর্জি, দ্রুত রায়ের আভাস

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি আংশিক নয়, বরং সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত আইনি লড়াই শুরু করেছে রিটকারী ও রাজনৈতিক দলগুলো, যার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসার সুনির্দিষ্ট আভাস মিলেছে। দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় পর গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বেঞ্চে এই মামলার শুনানি পুনরায় শুরু হয় এবং প্রথম দিনের দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ পরবর্তী শুনানির জন্য আজ মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর রহমান হক। অন্য দিকে আপিলকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া এবং মোহাম্মদ শিশির মনির। এ ছাড়া এই মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের পক্ষেও আলাদা আপিল দায়ের করা হয়েছে, যার সব ক’টি আপিলের শুনানি এখন সর্বোচ্চ আদালতে একসাথে চলছে।

শুনানি শেষে আপিলকারীদের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, বর্তমান আপিল বেঞ্চের একজন মাননীয় বিচারপতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে ১৩-১৪ জুলাইয়ের মধ্যে অবসরে যাবেন। যেহেতু এই বেঞ্চটি পূর্বেও মামলার বিস্তারিত শুনানি শুনেছে এবং সোমবার নতুন করে শুনানি শুরু করেছে, তাই আইনি নিয়ম অনুযায়ী এই বেঞ্চকেই শুনানি শেষ করে রায় ঘোষণা করতে হবে। উক্ত বিচারপতি অবসরে যাওয়ার আগে রায় ঘোষণা না হলে এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং পুরো শুনানি আগেরবারের মতো সম্পূর্ণ বিফলে যাবে। গতকাল সোমবার আদালতের মনোভাব ও তৎপরতা দেখে স্পষ্ট বোঝা গেছে যে তারা বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তিতে অত্যন্ত উদগ্রীব এবং আগে বিস্তারিত শোনা থাকায় অনেক কিছুই বিচারকদের স্মরণে রয়েছে।

আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া আশা প্রকাশ করেন, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যেই তিনি তার পক্ষের প্রধান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করবেন এবং আদালত দ্রুতই রায় ঘোষণা করবেন। পঞ্চদশ সংশোধনীকে ‘সংবিধানের পুনর্লিখন’ আখ্যা দিয়ে তিনি সাবমিশন করেন যে, এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বাতিল হওয়া প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে কোনো জনবিরোধী সংশোধনী জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা নস্যাৎ করতে না পারে। হাইকোর্ট বিভাগ পুরো সংশোধনীটি বাতিল না করায় তারা এই আপিল করেছেন এবং পুরোটা বাতিল করা হলে যদি কোনো আইনি শূন্যতা বা সমস্যা সৃষ্টি হয়, তবে আদালত কীভাবে আইনি সুরক্ষা দিতে পারেন, সে বিষয়েও তারা আদালতে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রস্তাবনা তুলে ধরবেন।

এর আগে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট বিভাগ। দেশের নির্বাচনব্যবস্থার সাথে সরাসরি যুক্ত বহুল আলোচিত এই মামলার শুনানি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল। তবে শুনানির প্রায় শেষপর্যায়ে এসে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত মামলাটির কার্যক্রম মুলতবি রাখার আদেশ দিয়েছিল। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। হাইকোর্টের রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তিসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারাকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ও সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করা হয়, যার ফলে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার আইনি পথ সুগম হয়।

হাইকোর্টের উক্ত রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ৭ (ক) অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল এবং ৭ (খ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানের বড় একটি অংশের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করা হয়েছিল। এ ছাড়া ৪৪ (২) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের রিট এক্তিয়ারের হানি না ঘটিয়ে সংসদকে অন্য যেকোনো নিম্নœ আদালতকে স্থানীয় সীমার মধ্যে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণের ক্ষমতা দেয়ার বিধান করা হয়েছিল, যা হাইকোর্ট বাতিল করে।

একই সাথে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধানটি পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিলুপ্ত করাকে মৌলিক কাঠামোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচনা করে তা বাতিল করা হয় এবং দ্বাদশ সংশোধনীর গণভোটসংক্রান্ত মূল ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনর্বহাল করা হয়। তবে হাইকোর্ট তার রায়ের পর্যবেক্ষণে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি পুরোটা বাতিল না করে বলেছিল, বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ দেশের আইন অনুসারে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। হাইকোর্টের এই আংশিক বাতিলের রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীটিই বাতিলের দাবিতে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করে রিটকারী মূল বাদিপক্ষ এবং এর ফলেই এই চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়ার অবতারণা হয়েছে।