তর্কে-বিতর্কে ৬০ পেনাল্টি

Printed Edition

আশিকুর রহমান

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে গোল, নাটকীয়তা ও চমক যতটা আলোচনায় এসেছে, তার সমান গুরুত্ব পেয়েছে পেনাল্টি, ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর) এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে একের পর এক টাইব্রেকার, স্বাভাবিক সময়ে পেনাল্টি থেকে কম গোল এবং ভিএআরকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক বিশ্বকাপের আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

এবারের বিশ্বকাপে স্বাভাবিক খেলার সময় ডি-বক্সের ভেতরে ফাউল বা হ্যান্ডবলের কারণে মোট ৬০টি পেনাল্টি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি থেকে গোল হয়েছে, ১০টি শট গোলরক্ষক ঠেকিয়েছেন এবং ১১টি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। ফলে সফলতার হার মাত্র ৬৫ শতাংশ, যা আধুনিক বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন। বিশ্লেষকদের মতে, গোলরক্ষকদের উন্নত প্রস্তুতি, ভিডিও বিশ্লেষণ এবং বাড়তি মানসিক চাপই কম সফলতার অন্যতম কারণ।

টাইব্রেকারে নতুন প্রবণতা

নকআউট পর্বে এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচ গড়িয়েছে টাইব্রেকারে। শেষ বত্রিশে মিসর অস্ট্রেলিয়াকে, মরক্কো নেদারল্যান্ডসকে এবং প্যারাগুয়ে জার্মানিকে হারায়। শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ড বিদায় করে কলম্বিয়াকে। চারটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে যে দল দ্বিতীয় শট নিয়েছে, তারাই জয় পেয়েছে।

শুধু এবারের বিশ্বকাপই নয়, সর্বশেষ ১৫টি বিশ্বকাপ টাইব্রেকারের মধ্যে ১৩টিতেই জয়ী হয়েছে দ্বিতীয় শট নেয়া দল। যদিও সামগ্রিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে ৩৯টি টাইব্রেকারের মধ্যে ২২টিতে দ্বিতীয় দল জিতেছে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে খুব বড় ব্যবধান নয়। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে বা পরে শট নেয়ার চেয়ে দক্ষ পেনাল্টি শুটার ও গোলরক্ষকের মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সাম্প্রতিক ১৫টি টাইব্রেকারের সাতটিতে প্রথম শট নেয়া দল শুরুতেই পেনাল্টি মিস করেছে এবং প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত হেরেছে।

কোন দল সবচেয়ে সফল?

টাইব্রেকারের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল আর্জেন্টিনা। তারা সাতটির মধ্যে ছয়টি জিতেছে, যার একটি ছিল ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল।

ক্রোয়েশিয়া এখনো অপরাজিত, চারটির চারটিতেই জয় পেয়েছে। অন্য দিকে দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে এবার প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ টাইব্রেকারে প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে জার্মানি।

সবচেয়ে হতাশাজনক রেকর্ড স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের। দুই দলই পাঁচটির মধ্যে চারটি টাইব্রেকারে হেরেছে। ইংল্যান্ডও বিশ্বকাপে চারটির মধ্যে তিনটি টাইব্রেকারে পরাজিত হয়েছে। অন্য দিকে মিসর, বেলজিয়াম ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো বিশ্বকাপ টাইব্রেকারে একটি পেনাল্টিও মিস করেনি।

মেসি-মদ্রিচের নিখুঁত রেকর্ড

টাইব্রেকারে লিওনেল মেসি ও লুকা মদ্রিচ তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে শতভাগ সফলতার সাথে পেনাল্টি নিয়েছেন।

তবে নিয়মিত খেলায় মেসির চিত্র ভিন্ন। বিশ্বকাপে স্পট-কিক থেকে তার সফলতার হার মাত্র ৫০ শতাংশ। এবারের আসরেই তিনি দু’টি পেনাল্টি মিস করেছেন।

ভিএআরকে ঘিরে বিতর্ক

এবারের বিশ্বকাপে ভিএআরের একাধিক সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে। মিসরের একটি গোল ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল হয় আক্রমণের অনেক আগের একটি ফাউলের কারণে। মিসরের কোচ ও খেলোয়াড়রা অভিযোগ করেন, আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে।

স্পেন-ফ্রান্স সেমিফাইনালেও বিতর্ক তৈরি হয়। লামিন ইয়ামালের ওপর ফাউলের সিদ্ধান্তে স্পেন পেনাল্টি পায়। কিন্তু রিপ্লেতে বল ইয়ামালের হাতে লেগেছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। ফ্রান্সের বিদায়ী কোচ দিদিয়ের দেশম ম্যাচ শেষে রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ ছাড়া সুইজারল্যান্ড-কাতার ম্যাচে অফসাইড প্রযুক্তির ত্রিমাত্রিক চিত্র প্রকাশ না হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেনেগাল-বেলজিয়াম ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে ভিএআরের সহায়তায় বেলজিয়ামের পাওয়া পেনাল্টিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

পরিসংখ্যান যা বলছে

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ৩৯টি টাইব্রেকারে মোট ৩৬০টি পেনাল্টি নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফরোয়ার্ডদের সফলতার হার ৭৩ শতাংশ, মিডফিল্ডারদের ৬৯ শতাংশ এবং ডিফেন্ডারদের ৬২ শতাংশ।

আরেকটি আকর্ষণীয় তথ্য হলো, ডান বা বাম কোণে নেয়া শটের সফলতার হার মাঝখানে নেয়া শটের তুলনায় বেশি। মাঝখানে নেয়া পেনাল্টির উল্লেখযোগ্য অংশ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

সবমিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, পেনাল্টি কেবল ভাগ্যের খেলা নয়; মানসিক দৃঢ়তা, কৌশল, গোলরক্ষকের প্রস্তুতি এবং ভিএআরের সিদ্ধান্ত সবকিছু মিলিয়েই এখন নির্ধারিত হচ্ছে বড় ম্যাচের ভাগ্য।