পদক পেলেন ববিতা, অর্জনে মিশে রইলেন গুরু জহির রায়হান

Printed Edition
পদক পেলেন ববিতা, অর্জনে মিশে রইলেন গুরু জহির রায়হান
পদক পেলেন ববিতা, অর্জনে মিশে রইলেন গুরু জহির রায়হান

সাকিবুল হাসান

বাংলার রুপালী পর্দার সেই কালজয়ী চোখ, যা একসময় মুগ্ধ করেছিল বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়কে, সেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা এবার ভূষিত হলেন রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক-২০২৬’-এ। গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে তিনি এই গৌরবময় পদক গ্রহণ করেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আইকন হয়ে থাকা এই অভিনেত্রীর প্রাপ্তিতে বিনোদন অঙ্গনে বইছে আনন্দের জোয়ার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শ্রম, মেধা আর ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদক গ্রহণ শেষে মিলনায়তনে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গুণীজনদের সাথে বেশ কিছুটা সময় কাটান তিনি। বরেণ্য এই অভিনেত্রীর সাথে একটি স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী হতে ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিল চোখে পড়ার মতো, আর ববিতাও চিরচেনা সেই স্নিগ্ধ হাসিমুখে সবার আবদার মিটিয়েছেন। পুরোটা সময় ববিতার পাশে ছায়ার মতো থেকে তাকে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা করেছেন তার ছোট বোন নন্দিত নায়িকা চম্পাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। একুশে পদকপ্রাপ্তির পর এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় ববিতা তার এই অনন্য অর্জনকে উৎসর্গ করেছেন তার মেন্টর ও পথপ্রদর্শককে। তিনি বলেন, ‘অবশেষে একুশে পদকপ্রাপ্ত হলাম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এই সম্মাননা গ্রহণ করতে পেরে আমি গর্বিত। রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ সম্মাননায় আমাকে ভূষিত করায় আমি রাষ্ট্র, দেশের মানুষ এবং আমার অগণিত দর্শকের প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই, কারণ আমি কেবল অভিনয় করেছি আর বিনিময়ে মানুষ আমাকে উজাড় করে ভালোবাসা দিয়েছেন। আজকের এই আনন্দের দিনে আমি বিশেষভাবে স্মরণ করছি এবং আমার এই পদকটি উৎসর্গ করছি শ্রদ্ধেয় শহীদ বুদ্ধিজীবী ও কালজয়ী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে। তার হাত ধরেই আমার চলচ্চিত্রে আসা, তার দেখানো পথেই আমার আজকের এই অবস্থান। তাই এই অর্জনের কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য।’

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ববিতা প্রায় তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। ‘নয়নমনি’, ‘বসুন্ধরা’, ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘রামের সুমতি’, ‘হাছন রাজা’, ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ এবং ‘কে আপন কে পর’ সিনেমার জন্য তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৬ সালে চলচ্চিত্রে তার সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাকে ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করে। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সঙ্কেত’ সিনেমায় অনঙ্গ বৌ চরিত্রে তার অভিনয় তাকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ আগস্ট ‘ববিতা ডে’ হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। ববিতার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘ববিতা মুভিজ’ থেকেও নির্মিত হয়েছে ‘ফুলশয্যা’, ‘আগমন’, ‘লটারি’, ‘চণ্ডিদাস রজকিনী’ ও ‘লেডি স্মাগলার’-এর মতো প্রশংসিত চলচ্চিত্র। ব্যক্তিগত জীবনে ববিতার একমাত্র সন্তান অনিক বর্তমানে কানাডায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। ববিতাকে সর্বশেষ ২০১৫ সালে নারগিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ সিনেমায় দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকে এক দীর্ঘ বিরতিতে রয়েছেন তিনি। রূপালী পর্দায় ফেরার বিষয়ে ববিতা তার অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, যদি তাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী কোনো গল্প আবর্তিত হয় এবং সেই চরিত্রটি যদি তার মনে দাগ কাটে, তবেই কেবল তিনি আবারো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন। অন্যথায়, সৃজনশীল তৃপ্তি না পেলে হয়তো আর কখনোই নতুন কোনো সিনেমায় তাকে দেখা যাবে না। রাজ্জাক, ফারুক, জাফর ইকবালদের মতো কিংবদন্তি নায়কদের সাথে পর্দা কাঁপানো এই অভিনেত্রীর একুশে পদক প্রাপ্তিতে দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত করছেন তাদের প্রিয় নয়নমনিকে।