নির্দলীয় ভোটের সমীকরণে ইসির স্থানীয় নির্বাচন প্রস্তুতি

কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো নির্বাচনেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না; পুরো নির্বাচন হবে সনাতন কাগজের ব্যালটে। এ ছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান বাদ দিয়ে এবার প্রার্থীদের সরাসরি (সশরীরে) মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো: সানাউল্লাহ। অন্য দিকে বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে শুরু প্রশাসনিক ব্যাপক প্রস্তুতি
  • তৃণমূলে সক্রিয় হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো
  • নির্দলীয় ভোটে স্থানীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে যাওয়ার আভাস
  • কাগজের ব্যালট ও সশরীরে মনোনয়নপত্র জমাদানের বাধ্যবাধকতা
  • নির্বাচন হওয়া না-হওয়া সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে- বিরোধী দল

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্তুতি জোরদার করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন, আচরণবিধি ও বিভিন্ন ধারা সংস্কারের কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে কমিশন। একই সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে জোর প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন প্রার্থী ও দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচনের সূচনা করতে চায় কমিশন, যা এখন সরকারের সবুজসঙ্কেতের অপেক্ষায় রয়েছে।

দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত থাকায় স্থানীয় রাজনীতির চেনা সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন কেবল এক সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, বরং জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ে দলগুলোর শক্তি-পরীক্ষার প্রধান মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইসি বেশ কিছু নীতিমালা ও বিধিমালার খসড়া তৈরি করে মতামত গ্রহণ ও গেজেটের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে।

কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো নির্বাচনেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না; পুরো নির্বাচন হবে সনাতন কাগজের ব্যালটে। এ ছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান বাদ দিয়ে এবার প্রার্থীদের সরাসরি (সশরীরে) মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো: সানাউল্লাহ। অন্য দিকে বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর।

স্থানীয় সরকার কাঠামোর চিত্র ও মেয়াদোত্তীর্ণের হালচাল : সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার মো: আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা বর্তমানে কমিশনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তবে তফসিল ঘোষণার আগে আইনি সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আবহাওয়াজনিত ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে কয়েক ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।

এখন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ৪,৫৯৯টি; ২০২১ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া বহু ইউপির আইনি মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রায় ৩,৬০০টি ইউপি আগস্ট-অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচনের যোগ্য হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ ৪৯৫টি; পর্যায়ক্রমে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাধীন। পৌরসভা ৩৩০টি; প্রথম ধাপের বেশ কিছু পৌরসভা মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদের শেষপ্রান্তে রয়েছে। আর সিটি করপোরেশন ১৩টি। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ মোট ১৩টি সিটি করপোরেশন ১০-১২ মাসের কর্মপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই গ্রামীণ সড়ক পুনর্নির্মাণ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স প্রদান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং এলজিইডির হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ফলে এই নির্বাচন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

অক্টোবর টার্গেটে ইসির কারিগরি ও আইনি সংস্কার : নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হালনাগাদ ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে, যা আগস্টের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে প্রাথমিক সমন্বয় শুরু হয়েছে।

ব্যালট ও জামানত : ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫,০০০ টাকা করা হচ্ছে (সংরক্ষিত নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৫,০০০ টাকা)।

আচরণবিধি সংশোধন : ‘স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০২৬’ এবং ‘পৌরসভা নির্বাচন আচরণ বিধিমালা’র খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এতে নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর কঠোর নির্দেশনা যুক্ত রয়েছে।

ভোটার ও কেন্দ্রের পরিসংখ্যান : ইসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারসংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৬০টি।

মাঠে দলগুলোর তৎপরতা ও নির্দলীয় সমীকরণ

অফিসিয়াল তফসিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য দল নিজেদের তৃণমূল সংগঠন পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের অনেক নতুন মুখ মাঠে নামতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, যেসব দলের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব কিছুটা কম, স্থানীয় সামাজিক ভিত্তির জোরের কারণে নির্দলীয় নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।

ইসিতে জামায়াতে ইসলামীর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে বেশ কিছু আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

১. সংরক্ষিত নারী আসন ও ভোটব্যবস্থা : ইউপি ভোটে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদ তুলে দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারীদের সরাসরি সাধারণ ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেয়া।

২. অপপ্রচারে ডিজিটাল ডিভাইস নিষিদ্ধ : প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিসে ভিসিআর বা সাধারণ টিভির পাশাপাশি প্রজেক্টর, এলইডি ডিসপ্লে ও ল্যাপটপ ব্যবহারের ওপর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা।

৩. মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে নিষেধাজ্ঞা : নির্বাচনী প্রচারে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) অংশ নেয়ার ওপর স্পষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা প্রদান।

৪. আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অযোগ্য ঘোষণা : সরকার কর্তৃক যেসব দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে, তাদের সক্রিয় নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা।

৫. প্রশাসকদের প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ : স্থানীয় সরকার বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পদে থাকা কোনো বর্তমান প্রশাসক পদে বহাল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না-এমন বিধান যুক্ত করা।

৬. প্রার্থিতা ও গণমাধ্যম : কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে প্রার্থীর আইনি আপিল সুযোগ রাখা এবং ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য

বিএনপির অবস্থান : স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, তাই কে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বা পারবেন না, সেটি নির্ধারণ করবে প্রচলিত আইন, নির্বাচন কমিশন ও আদালত। অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের মনগড়া দাবির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় দলীয় ফোরামে আলোচনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী সমর্থনের বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হবে।’

জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য : জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ নয়া দিগন্তকে জানান, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সরকারের মনোভাব ও সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। গত পাঁচ মাসে সরকারের কাজের সাথে বক্তব্যের সম্পূর্ণ মিল আমরা দেখিনি। আমরা চাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। যেহেতু সংসদে আইন পাস হয়ে এটি নির্দলীয় রূপ নিয়েছে, তাই কেন্দ্র থেকে দলীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ নেই। তবে মাঠপর্যায়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা সমঝোতার মাধ্যমে কোনো একক প্রার্থী সমর্থন করলে তা আলাদা বিষয়।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কথা : এনসিপির প্রতিনিধি সারোয়ার তুষার মুঠোফোনে নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আমাদের দল থেকে পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রার্থীদের প্রথম দফায় ১০০ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় দফা তালিকা প্রকাশ করা হবে, যাতে প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে কাজ করতে পারেন। তবে নিষিদ্ধ বা স্থগিত কোনো দলের সদস্য ছিলেন না- এমন একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা প্রার্থীদের কাছ থেকে নেয়ার দরকার ছিল। নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে তা সম্পূর্ণ সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।’