আলজাজিরা
সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়া সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে শি জিনপিং ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গভীর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বৈঠকে দুই নেতা কৌশলগত যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাণিজ্য, কৃষি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। একই সাথে দুই দেশের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা কেসিএনএ জানিয়েছে, সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শি জিনপিং কিম জং উনকে বলেন, তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে চান। উভয় নেতা ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হন। কিম জং উনও দুই দেশের বন্ধুত্বকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে শি জিনপিংকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় অতিথি’ বলে অভিহিত করেন কিম জং উন । এ সময় তিনি বলেন, চলতি বছরে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে বেছে নেয়া পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি ‘সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক সমর্থনের’ বার্তা বহন করে। একই সাথে তিনি বেইজিংয়ের ‘এক চীন নীতি’র প্রতি উত্তর কোরিয়ার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। এর মাধ্যমে তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনার বিষয়ে পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থানও স্পষ্ট হয়। এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, শি জিনপিং বাণিজ্য, কৃষি, নির্মাণ ও প্রযুক্তিসহ বিস্তৃত খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দুই দেশের উচিত কৌশলগত সহযোগিতা আরো জোরদার করা এবং নিজ নিজ সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা।
এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেশী দুই দেশের বন্ধুত্ব চুক্তির ৬৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সফরে শি জিনপিং ঘোষণা করে বলেন, চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক ‘একটি নতুন ঐতিহাসিক সূচনা বিন্দুতে’ পৌঁছেছে।
পিয়ংইয়ং বিমানবন্দরে শি জিনপিংকে লাল গালিচা, গার্ড অব অনার এবং ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরে দুই নেতা তাদের স্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সাথে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করেন। এরপর চীনা প্রতিনিধিদলের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন কিম জং উন।
এটি ছিল সাত বছরের মধ্যে শি জিনপিংয়ের প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনসহ বিভিন্ন বিদেশী নেতার উপস্থিতিতে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে শি ও কিমের সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল।
দুই নেতার মধ্যে আরো কোন বৈঠক হবে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যম জানিয়েছে, শি জিনপিং পিয়ংইয়ংয়ের চীন-কোরিয়া মৈত্রী স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শন করতে পারেন। ১৯৫০-এর দশকের কোরীয় যুদ্ধে নিহত চীনা সেনাদের স্মরণে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল।
কোরীয় যুদ্ধে চীনের সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দুই দেশ প্রায়ই তাদের সম্পর্ককে ‘রক্তে গড়া বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞায় চীনের সমর্থনের কারণে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়ে আলজাজিরার সিউল প্রতিনিধি জ্যাক বার্টন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে সৈন্য ও অস্ত্র সরবরাহের বিনিময়ে তেল ও সহায়তার জন্য উত্তর কোরিয়া ক্রমশ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এ পরিস্থিতিতে বেইজিং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই মিত্রের ওপর নিজের প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
বার্টনের মতে, রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক উষ্ণ হলেও কিম জং উন চীনকে কাছেই রাখতে চান। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে রাশিয়ার উত্তর কোরিয়ার সৈন্য বা অস্ত্রের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা অনেকাংশেই চীনের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে পিয়ংইয়ংকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে ধরে রাখতে চাইবে বেইজিং। বিশ্লেষক ইয়াং বলেন, বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার সামরিক-শিল্প খাত রাশিয়ার সঙ্গে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত। তাই এই সফরের মাধ্যমে শি জিনপিং উত্তর কোরিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন যে তাদের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার এখনো চীনই।
তিনি আরও বলেন, চীন উত্তর কোরিয়ায় পর্যটন সম্প্রসারণেও আগ্রহী। বিশেষ করে কোরীয় যুদ্ধকে ঘিরে বিপ্লবী স্মৃতিচারণভিত্তিক ‘রেড ট্যুরিজম’ বাড়ানোর বিষয়টি সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শি-কিম বৈঠকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি। শির সফরের আগে কিম জং উন পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। উত্তর কোরিয়ার এই কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যার বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং।
আল জাজিরার বেইজিং প্রতিনিধি ক্যাটরিনা ইউ বলেন, বৈঠকের আলোচ্যসূচি থেকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টির অনুপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, দুই দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে শি ও কিম বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চাইছেন- চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি আরো বলেন, চলতি বছরে ভøাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বহু বিশ্বনেতাকে আতিথ্য দিলেও শি জিনপিংয়ের এটি ছিল প্রথম বিদেশ সফর। ফলে উত্তর কোরিয়াকে তিনি যে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা স্পষ্ট। বেইজিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন উত্তর কোরিয়াকে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার এই সময়ে চীন চাপ প্রয়োগের বদলে প্রণোদনাভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিয়ংইয়ংয়ের সাথে সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়িয়ে গভীর সহযোগিতার নতুন বার্তা দিচ্ছে বেইজিং।



