নিজস্ব প্রতিবেদক
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাব্য কৌশলগত গুরুত্ব, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব এবং পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তায় যেকোনো হুমকি মোকাবেলায় এই সমঝোতা বড় ধরনের কৌশলগত সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) উদ্যোগে গত শুক্রবার রাজধানীতে প্রতিষ্ঠানটির সম্মেলনকক্ষে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিএসপিএসের চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়ার সভাপতিত্বে এবং নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খালিলী।
আলোচনায় দেশের স্বনামধন্য বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, গবেষকসহ বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সাবেক সচিব ড. আবুল হোসেন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ড. মুহাম্মদ ইউনূস আলী, লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) দিদার, কর্নেল (অব.) মো: জাকারিয়া হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত, গবেষক শাহ আব্দুল হালিম, ব্যাংকার মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার, এনএসআইয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক প্রমুখ।
মূল বক্তব্যে মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণœ রেখে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। মক্কা চুক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে না দেখে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সম্ভাব্য নতুন কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
আলোচনায় বলা হয়, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যেকোনো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্প এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ভবিষ্যতে এ চুক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি দিতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ পরিসর নির্ভর করবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামরিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর।
আলোচনায় বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে বলেও মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।
তারা বলেন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সাথে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখে একটি কার্যকর কৌশলগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয়টি শুধু সামরিক সহযোগিতার প্রশ্ন নয়, বরং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
বক্তারা বলেন, কোনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোয় বাংলাদেশ যুক্ত হবে কি না- সে সিদ্ধান্ত দেশের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রয়োজন বিবেচনা করে বাংলাদেশকেই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আপত্তি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না।
আলোচনায় কেউ কেউ প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কা চুক্তির সাথে বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষক হিসেবে সম্পৃক্ত করার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেন। তবে পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের আগে চুক্তির সামরিক বাধ্যবাধকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্ভাব্য সঙ্ঘাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব এবং এর ফলে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে পর্যালোচনা করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে বহুমাত্রিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্র নিরাপত্তার পাশাপাশি তথ্য ও বয়াননির্ভর চাপ মোকাবেলায় নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
আলোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রভাব এবং সমুদ্র ও সাইবার ক্ষেত্রে প্রতিরোধক্ষমতাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে নতুন কোনো নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বিবেচনার ক্ষেত্রে সামরিক সুবিধার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্ভাব্য প্রভাবও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আলোচনার সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়া বা না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির সাথে কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, সেটিই মূল বিষয়।
এ নীতিকে আলোচনায় ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা নয়’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের অধীন না হয়ে বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রেখে একটি ‘সেতুরাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
বৈঠকে মত দেয়া হয়, মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। তবে এতে সম্পৃক্ততার আগে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিয়ে একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া নয়, বরং নিজ স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় কৌশলগত সক্ষমতা তৈরি করা। বহুমুখী অংশীদারিত্ব, নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি- এই তিনটির সমন্বয়ই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।



