ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে

সহিংসতা দেখালেই টিভি ক্র্যাশ করাতে স্যাটেলাইটকে নির্দেশ আরাফাতের

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সঙ্ঘাত ও সহিংসতার সংবাদ সম্প্রচার বন্ধে সরাসরি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ব্যবহারের নজিরবিহীন অপচেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। টিভিতে সঙ্ঘাতের কোনো ভিডিও ফুটেজ বা ছবি প্রদর্শিত হওয়ার সাথে সাথেই লাইভ সম্প্রচার ‘ক্র্যাশ’ (বন্ধ) করার জন্য স্যাটেলাইট কর্তৃপক্ষকে আগাম স্বয়ংক্রিয় নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।

আলমগীর কবির
Printed Edition

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সঙ্ঘাত ও সহিংসতার সংবাদ সম্প্রচার বন্ধে সরাসরি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ব্যবহারের নজিরবিহীন অপচেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। টিভিতে সঙ্ঘাতের কোনো ভিডিও ফুটেজ বা ছবি প্রদর্শিত হওয়ার সাথে সাথেই লাইভ সম্প্রচার ‘ক্র্যাশ’ (বন্ধ) করার জন্য স্যাটেলাইট কর্তৃপক্ষকে আগাম স্বয়ংক্রিয় নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।

একই সাথে আন্দোলন দমনে তাৎক্ষণিক কঠোর সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি এবং মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্যাডার বহর নামাতে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক জোগান দেয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে একাধিক গোপন ফোনালাপে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শীর্ষ সরকারি নীতিনির্ধারকদের ফাঁস হওয়া বেশ কয়েকটি ফোনালাপ তুলে ধরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের চতুর্থ দিনে গতকাল সোমবার প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন ট্রাইব্যুনালে এসব অডিও রেকর্ড বাজিয়ে শোনান।

আদালতে উপস্থাপিত ফোনালাপে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে কথা বলতে শোনা যায়। সেখানে আরাফাত জানান, আন্দোলন দমনে সঙ্ঘাতের খবর প্রচার করলে চিরতরে টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

আরাফাত ফোন আলাপে বলেন, ‘আজকে ওদেরকে বলছি যে, যদি কোনো সঙ্ঘাতের বা মারামারির ভিডিও ফুটেজ কিংবা ছবি দেখায়, ওদেরকে এলিমিনেশন অব দ্য স্ট্যাটাস ডিক্লেয়ার (মর্যাদা বাতিল) করা হবে এবং সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেবো। আমি থ্রেট (হুমকি) দিয়ে রাখছি আজকে।’

এর পরপরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আর ওই যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটগুলোকে বসায় রাখছি যে, আপনি কনস্ট্যান্টলি (সব সময়) দেখবেন যে টিভি ক্র্যাশের ছবি দেখাবে, সাথে সাথে অফ করে দিবেন। আমার কোনো পারমিশনের (অনুমতি) জন্য মেসেজ পাঠাবেন না। আপনাকে অটো পারমিশন (স্বয়ংক্রিয় অনুমতি) দিয়ে রাখলাম।’

সান্ধ্য আইন নিয়ে আনিসুল-সালমান ফোনালাপ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের কথোপকথনও উপস্থাপন করা হয়। যেখানে ছাত্রদের আন্দোলন দমনে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ বা সান্ধ্য আইন জারির অপকৌশল নিয়ে তাদের আলোচনা করতে দেখা যায়।

আনিসুল হককে বলতে শোনা যায়, ‘এখন কথা হচ্ছে যে, টু স্কুল অব থটস (দুই ধরনের চিন্তাভাবনা)। একটা হচ্ছে যে আজকে রাত্রেই কারফিউ (সান্ধ্য আইন) দিয়ে ওদেরকে শেষ করে দেয়া... আরেকটা হচ্ছে ইউ নো গো ফর দ্য রিয়েল হার্ম (মূল আঘাতের দিকে যাওয়া)।’ জবাবে সালমান এফ রহমান সায় দিয়ে বলেন, ‘নো। দ্য ফার্স্ট অপশন ইজ ওয়ার্কিং, দ্যাটস হোয়াট উই শুড ডু (না, প্রথম বিকল্পটি কাজ করছে, আমাদের সেটাই করা উচিত)।’

এ সময় তারা আরো আলোচনা করেন যে এই কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর (নর্থ সাইড) অংশগ্রহণ বা হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হবে কি না।

মাঠের কর্মীদের টাকা জোগানের দায়িত্বে সালমান

ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের মধ্যকার ২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের আরেকটি ফোনালাপে উন্মোচিত হয় কিভাবে মাঠ পর্যায়ে সংঘর্ষ বজায় রাখতে কোটি কোটি টাকা বণ্টন করা হয়েছিল।

মির্জা আজম ফোনালাপে বলেন, ‘কারফিউ চলাকালীন আমাদের কিছু প্রিপারেশন থাকা দরকার। ওয়ার্ড পর্যায়ে লোক রাখতে হইলে টাকা দিতে হইব। কিন্তু এমপিরা কেউ কোনো টাকা খরচ করে না।’ সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ ও আরাফাতের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আজম বলেন, ‘ধানমন্ডির ফেরদৌস, আরাফাত; এগুলা এলাকায় টাকা দিবো তো দূরের কথা, তারা কারো টেলিফোনও ধরে না।’

জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, এসব টাকার জোগান দিচ্ছেন সালমান এফ রহমান। যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও মূল দলের বিভিন্ন শাখায় ৫২ লাখ টাকা প্রথম দফায় বণ্টনের পরিকল্পনা জানান কাদের। পরে মির্জা আজম টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ করার অনুরোধ জানালে কাদের তা জোগাড়ের আশ্বাস দেন।

অহিংস আন্দোলনকে সঙ্ঘাত প্রমাণের কৌশল

গণমাধ্যম ও অর্থের মারপ্যাঁচ ছাড়াও কোটা আন্দোলনকে সহিংস ট্যাগ দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ন্যারেটিভ (মনস্তাত্ত্বিক বয়ান) তৈরির চিত্রও ফোনালাপগুলোতে ধরা পড়েছে। আরাফাত ওবায়দুল কাদেরকে জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলন থেকে আলাদা করে ‘জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে সান্ধ্য আইন জারির সিদ্ধান্তকে জায়েজ করার চেষ্টা চলছে।

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামীম ট্রাইব্যুনালকে জানান, এসব রেকর্ড করা কথোপকথনই স্পষ্ট দাফতরিক প্রমাণ যে কীভাবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং অবৈধ অর্থ সরবরাহ করে একটি নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যা চালায় তৎকালীন সরকার। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং রাজপথে সহিংসতা উসকে দিতে এসব শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি জড়িত ছিল যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ অডিও রেকর্ডটি নথিভুক্ত করে পরবর্তী যুক্তিতর্কের জন্য আজ মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। মামলার সব আসামিই পলাতক।