কূটনৈতিক প্রতিবেদক
- খলিলুর রহমান ও হাকান ফিদান যৌথ সংবাদ সম্মেলন
- সংস্কৃতি বিষয়ে দুই দেশের এমওইউ স্বাক্ষর
- আজ প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ
বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, আমরা দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে বিস্তৃত পরিসরে আরো গভীর করতে এবং এটিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর আরো শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ এক দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার থেকে দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে সম্ভাব্য উদ্যোগগুলো খতিয়ে দেখছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি।
সফররত তুর্কিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, গভীর ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ আমাদের দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের রয়েছে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশের সাথে আমাদের বহুমুখী সহযোগিতার পরিধি বহু বিস্তৃত। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করতে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে আমাদের যৌথ অঙ্গীকারকে আরো শক্তিশালী করতে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখব।
গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদান এসব কথা বলেন। এর আগে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে একান্ত ও পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিজ নিজ দেশের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হক উপস্থিত ছিলেন।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিন দেখতে কক্সবাজার যান। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক সম্পর্কে হাকান ফিদান বলেন, আজকের বৈঠকে আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আমাদের সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে আমাদের অভিন্ন অবস্থান এবং সহযোগিতার বিষয়গুলোকে আরো শক্তিশালী করতে সম্মত হয়েছি। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে বাংলাদেশ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে এক বিশাল মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। দুর্ভাগ্যবশত, রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা এখনো অব্যাহত রয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ ও সংস্থাগুলোর সাথে সংহতি ও সমন্বয়ের সাথে কাজ করে যাচ্ছি। এই সঙ্কটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচ্যসূচিতে রাখার জন্য আমরা নিবিড় প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের অবস্থার উন্নতির জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আমরা তাদের নিজ দেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনেও সমর্থন অব্যাহত রাখব।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই বিজয় বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শ্রদ্ধার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন। জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা এবং খলিলুর রহমানের ব্যাপক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি সফলভাবে পালন করবেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে হাকান ফিদান বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি রক্ষা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আমাদের প্রচেষ্টায় খলিলুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। তুরস্ক তাকে আগের মতোই দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে খলিলুর রহমান বলেন, তুরস্কের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এর আগ পর্যন্ত অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) নিয়েও আলাপ হয়েছে। ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য তুরস্ককে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, জাহাজ তৈরি, বস্ত্র, ওষুধ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ দর্শনে আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি চালিত হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশ একা। এর মানে হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণের বিষয়ে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে। একই সাথে এটা এমন বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটাচ্ছে যে বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে আমাদের বন্ধু ও অংশীদার রয়েছে, প্রভু নয়।
সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে চলা কূটনীতিতে বাংলাদেশ জোরালোভাবে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশের সাথে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সহযোগিতার বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অভিন্ন স্বার্থ, আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি সম্মান, অংশীদারত্ব ও বন্ধুত্বের চেতনা। আমরা আরো বিশ্বাস করি, আমাদের সময়ের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা অপরিহার্য। শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অভিন্ন উন্নতি এবং পারস্পরিকভাবে মঙ্গলজনক সহযোগিতার প্রসারে তুরস্কের মতো দেশের সাথে বাংলাদেশ কাজ করে যাবে।



