আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
- ডাউকি ফল্টের কারণে চরম ঝুঁকিতে সিলেট অঞ্চল
- ঘন ঘন কম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ : ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার
সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্পে ‘ডেঞ্জার জোন’ খ্যাত সিলেটজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ আশঙ্কার মাঝে দিন কাটাচ্ছেন সিলেট নগরীর ২০ লাখ বাসিন্দাসহ এ অঞ্চলের প্রায় কোটি মানুষ। সর্বশেষ গত রোববার রাত ১১টা ৪১ মিনিটে দেশজুড়ে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে সিলেট অঞ্চল তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে। মধ্যরাতের এই কম্পনে নগরবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। সিলেট ছাড়াও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই কম্পন অনুভূত হয়।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, এর আগে ১৯ মে বেলা ১টা ১ মিনিটে সিলেটসহ দেশজুড়ে আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সিলেটের কাছাকাছি হবিগঞ্জের গজনাইপুর ছিল সেই ভূমিকম্পের মূল উৎপত্তিস্থল; যা ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার দূরে। এ ছাড়া গত ২১ এপ্রিল সকালেও সিলেটে মৃদু কম্পন অনুভূত হয়।
ইউএসজিএসের তথ্য ও আবহাওয়াবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী মাস ছিল ফেব্রুয়ারি। এই মাসের মাত্র ২৬ দিনেই দেশে ৯ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। স্বল্প সময়ে এত ঘন ঘন কম্পনের ঘটনা অতীতে আর দেখা যায়নি। যদিও এসব কম্পনের মাত্রা ছিল মৃদু ও মাঝারি, তবুও সিলেট অঞ্চলের মানুষের মন থেকে আতঙ্ক কাটছে না।
ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় ৩ মাত্রার মৃদু ভূমিকম্প হয়। যার উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। ৩ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টা ৩৬ মিনিটে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪.১ মাত্রার কম্পন হয়। একই দিন রাতে মিয়ানমারে উৎপত্তিস্থল হওয়া যথাক্রমে ৫.৯ ও ৫.২ মাত্রার দু’টি কম্পন অনুভূত হয়। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় যথাক্রমে ৩.৩ ও ৪ মাত্রার দু’টি ভূমিকম্প হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় উৎপত্তিস্থল হওয়া ৪.১ মাত্রার কম্পনে কাঁপে সিলেট। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পরপর দুই দিন সিলেটসহ সারা দেশে কম্পন অনুভূত হয়। এর মধ্যে ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিটের কম্পনটির মাত্রা ছিল ৪.৬।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ভূতাত্ত্বিকভাবে এই ঘন ঘন ছোট ও মাঝারি কম্পনকে বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ভূ-অভ্যন্তরীণ বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় ভূগর্ভে বিপুল শক্তি জমা হয়ে আছে, যা বড় বিপর্যয়ের রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে অপরিকল্পিত মেগা সিটি ঢাকা যেমন ঝুঁকিতে পড়বে, ঠিক তেমনি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট। বিশেষ করে ‘ডাউকি ফল্ট’-এর কাছাকাছি হওয়ায় সিলেটে যদি ৬ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
ভূমিকম্প মোকাবেলায় করণীয়
যেহেতু এ দুর্যোগের আগাম সতর্কবাতা দেয়া অসম্ভব। তাই এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় উদ্ধার তৎপরতার চেয়ে পূর্বপ্রস্তুতি ও সচেতনতায় জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনা নিশ্চিত করা এবং স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন সংস্থায় নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া ঘরে থাকাবস্থায় ভূমিকম্প শুরু হলে দ্রুত ‘ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড অন’ (উবু হয়ে বসে, কোনো শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নেয়া এবং শক্ত করে ধরে রাখা) পদ্ধতি অনুসরণ করার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার।



