বাবা ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে দুই ছেলের উদ্বেগ

Printed Edition

আলজাজিরা

কারাগারে দিন কাটছে ৭৩ বছর বয়সী সাবেক পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের। গত তিন বছর ধরে রাওয়ালপিণ্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী থাকা ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খান। সম্প্রতি লন্ডনে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তারা বাবার চিকিৎসার অভাব ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তবে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবি সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে।

ছেলেদের উদ্বেগ ও শারীরিক অবস্থার বর্ণনা

সুলাইমান (২৯) ও কাসিম (২৭) জানান, গত মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের সময় সর্বশেষ তারা বাবার সাথে ২০ মিনিটের জন্য ফোনে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। কাসিম বলেন, কথা বলার সময় ইমরান খান নিজের শারীরিক অবস্থা গোপন রেখে ছেলেদের জীবনের খোঁজখবর নেন। ২০২২ সালে আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ঘুষ গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস ও সরকারি উপহার বিক্রির মতো শতাধিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। যার একটি ছাড়া বাকি সব সাজা স্থগিত বা বাতিল হলেও এখনো আপিল ঝুলন্ত রয়েছে। পরিবার ও পিটিআই নেতাকর্মীদের দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সম্প্রতি কারাগারে দেখা করে এসে তার দুই বোন উজমা ও নোরিন জানান, ইমরান খানকে নির্জন কারাবাসে রেখে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। সুলাইমান ও কাসিম উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে কারাগারে তাদের বাবার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে এবং বুক ধড়ফড় করছে। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারি থেকে তার ডান চোখের ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাক্ষাৎকালে চোখে পট্টি বাঁধা ছিল। পরিবারের দাবি, আদালতের আদেশ সত্ত্বেও টানা ১০ মাস তাকে কোনো দর্শনার্থীর সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি।

আইনি পদক্ষেপ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া : গত ১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারকের বেঞ্চ নির্দেশ দেন, ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে বেসরকারি শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে, পরিবারকে সপ্তাহে এক দিন সাক্ষাৎ ও ছেলেদের সাথে দুই দিন ফোনালাপের অনুমতি দিতে হবে এবং তার চিকিৎসা বোর্ডে ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বোনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে ২০ আগস্ট তাকে স্বল্প সময়ের জন্য সরকারি পিমস (চওগঝ) হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ফের কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়, যার প্রেক্ষিতে আদালতে অবমাননার পিটিশন দায়ের করেছে পিটিআই। সুলাইমান অভিযোগ করেন, সরকারি চিকিৎসকরা শেখানো কথা বলছেন এবং সরকার নিরপেক্ষ শারীরিক পরীক্ষা এড়াতে তথ্য লুকাচ্ছে।

পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনীতি করা অনুচিত। মন্ত্রণালয় জানায়, কারাগারে নিয়মিত চিকিৎসক ছাড়া ইমরান খানের ৩০ বার শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি সুস্থ ও স্থিতিশীল আছেন। সরকারি নথিতে দেখা গেছে, ৯০০ জনের বেশি দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে প্রায় ১৯৮টি সাক্ষাৎ সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি তার থাকার ব্যবস্থা মানবিক এবং খাদ্যে গোশত, ফল, দুধ ও জুসের সুব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগ : জাতিস্ঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ওয়াশিংটন ও লন্ডনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সহ সাবেক ২১ জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খানের মুক্তির পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। প্রাক্তন স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তিনি জানান, ব্রিটিশ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ইমরান খানের দুই ছেলেকে পাকিস্তান ভ্রমণের জন্য ভিসা দেয়া হচ্ছে না। পিতার স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করে কাসিম নিরপেক্ষ চিকিৎসকদের দিয়ে পরীক্ষা ও রিপোর্ট প্রকাশের জোর দাবি জানান। তা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করেন, তীব্র প্রতিকূলতার মাঝেও তার বাবা আত্মশক্তিতে অবিচল ও দৃঢ় থাকবেন।