বিশেষ সংবাদদাতা
কল্পনা করুন ২০৫০ সালের বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা তীব্র হয়েছে। বর্ষায় আকস্মিক বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির তীব্র সঙ্কট এক নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই চরম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ আর গ্যাস বা কয়লা নয়, তা হলো ‘পানি’। এই পানিকে কেন্দ্র করে ২০৫০ সালের বাংলাদেশের জন্য দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যপট (ঝপবহধৎরড়ং) তৈরি হতে পারে।
দৃশ্যপট এক : ডেল্টা পুনর্জাগরণের বাংলাদেশ : যদি বাংলাদেশ আগামী দুই-তিন দশকে সফলভাবে এই অববাহিকাভিত্তিক ‘ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড’ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে দেশের পানি-খাদ্য-জ্বালানি ব্যবস্থার চরিত্র মৌলিকভাবে বদলে যাবে।
খাদ্যনিরাপত্তার নতুন যুগ
বাংলাদেশের কৃষি এখনো বহুলাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে নির্ভরযোগ্য পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। এক ফসলি জমিগুলো দ্রুত বহুফসলি চাষে রূপান্তরিত হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তার যুগেও দেশের খাদ্য সরবরাহকে শতভাগ স্থিতিশীল রাখবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর
লবণাক্ততা ও পানির অভাবে মৃতপ্রায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পদ্মাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা চালু হলে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়বে। এটি সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা করবে এবং অঞ্চলটিকে বহুমুখী কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের নতুন অর্থনৈতিক হাবে (ঊপড়হড়সরপ ঐঁন) রূপান্তর করবে। নদীর নাব্যতা ফিরলে নৌপরিবহন লজিস্টিকস খরচ কমিয়ে শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
নদীকেন্দ্রিক লজিস্টিকসের পুনর্জন্ম
একসময় নদী ছিল দেশের অর্থনৈতিক মহাসড়ক। এই প্রকল্পের ড্রেজিং ও নদীশাসনের ফলে অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলো পুনরায় সচল হবে। সড়ক ও ডিজেলনির্ভর পরিবহনের ওপর চাপ কমায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনেক সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হবে।
দৃশ্যপট দুই : অবকাঠামো ও ঋণের ফাঁদ
এই মহাপরিকল্পনার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। যদি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এই মেগা-প্রকল্পগুলো সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার অভাবে ব্যর্থ হয়, তবে ২০৫০ সালের দৃশ্যপট হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা : ৫ লাখ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি ও সুদের চাপ জাতীয় বাজেটকে পঙ্গু করে দিতে পারে। যদি অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পরও কৃষি ও জ্বালানি খাতের উৎপাদনশীলতা আশানুরূপ না বাড়ে, তবে এই বিনিয়োগ সরাসরি রাজস্ব না এনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঘাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেবে।
পরিবেশগত বিপর্যয় : নদী অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জীবন্ত একটি সিস্টেম। ব্যারাজ ও রেগুলেটর নির্মাণের ফলে যদি মাছের প্রজনন চক্র ব্যাহত হয় কিংবা পলি ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয়ে নদীর গতিপথ বদলে যায়, তবে পরিবেশগত ক্ষতি প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভকে ছাড়িয়ে যাবে।
জলবায়ু মডেলের অনিশ্চয়তা ও নমনীয় নকশা
২০৫০ সালের জলবায়ু পরিস্থিতি কেমন হবে, তা আজ নিখুঁতভাবে বলা কঠিন। বৃষ্টিপাতের ধরন বা নদীর প্রবাহের পরিমাণ ওলটপালট হতে পারে।
প্রয়োজন ফ্লেক্সিবল বা নমনীয় নকশা : তাই বিশেষজ্ঞরা কঠোর বা অচল (জরমরফ) অবকাঠামোর পরিবর্তে এমন এক অভিযোজনযোগ্য ও নমনীয় নকশার (ঋষবীরনষব উবংরমহ) তাগিদ দিচ্ছেন, যা পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজের কার্যকারিতা ধরে রাখতে পারবে।
শেষ কিস্তিতে পড়ুন : “আদানি থেকে পদ্মা : খণ্ডিত উন্নয়ন বনাম সমন্বিত ডেল্টা দর্শনের সিদ্ধান্ত”



