রাজনীতি যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গ্রাস করে, অর্থনীতি তখন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়

মন্তব্য প্রতিবেদন

মাসুমুর রহমান খলিলী
Printed Edition

রাজনীতি যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে অর্থনীতি একসময় সেই দেশের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক গণমাধ্যমে আমার এই মন্তব্যের পর অনেকেই এর নেপথ্যের কার্যকারণ ও ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। মূলত সেই কৌতূহল ও প্রাসঙ্গিকতা থেকেই এই বিশদ বিশ্লেষণ :

একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল মুদ্রা ছাপানোর কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের কঠোর তদারকি, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভারসাম্য নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের ওপরই ন্যস্ত। আর এ কারণেই বিশ্বের প্রায় সব সফল ও টেকসই অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যখন রাজনীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা ও গোষ্ঠীতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয়। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে

কেবল অর্থনৈতিক সঙ্কটই তৈরি করে না, বরং অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় বৈধতার সঙ্কট ডেকে আনে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেন অপরিহার্য?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু মুদ্রানীতি ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সম্পূর্ণ পেশাদার ও স্বতন্ত্র ভূমিকা থাকা জরুরি। এর মূল কারণ হলো, রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তা বা পরবর্তী নির্বাচনের সমীকরণ মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়। বিপরীতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভাবতে হয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক টেকসইতার কথা। যেমন নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে সরকার বাজারে দেদার টাকা

ছাড়তে চাইতে পারে, কৃত্রিমভাবে সুদের হার কমিয়ে রাখতে পারে কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেদার ঋণ নিতে পারে। এসব পদক্ষেপ সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধির এক ধরনের ভ্রম বা ‘ইল্যুশন’ তৈরি করলেও, অচিরেই তা লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার জন্ম দেয়।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মতে, ‘খারাপ কিংবা অদূরদর্শী রাজনীতিবিদদের হাত থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করার শেষ প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল বা দুর্গের নামই হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির গত এক বা দেড় দশকের দিকে তাকালে দেখা যাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে বারবার গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অনুকূলে বিশেষ ঋণ সুবিধা, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বারবার ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজিরবিহীন অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ঘটনা অর্থনীতিকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন ও কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং তারা সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং প্রভাবশালী মহলের স্বার্থের সাথে অতিরিক্ত ‘সমন্বয়’ করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় আর্থিক সতর্কতা, কঠোর নজরদারি ও ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের এই ঘাটতি এবং বড় ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে বাজারে একটি নেতিবাচক বার্তা গেছে, ‘নিয়ম সবার জন্য সমান নয়’। এর ফলস্বরূপ আর্থিক খাতে মারাত্মক ‘নৈতিক ঝুঁঁকি’ তৈরি হয়েছে, যা সৎ ব্যবসায়ী ও সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ধসিয়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক সঙ্কট যেভাবে রাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নেয়

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, পৃথিবীর বুকে অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থান বা অস্থিরতার পেছনে অর্থনৈতিক সঙ্কটের ভূমিকা ছিল অনুঘটক হিসেবে।

প্রথম ধাপ : মূল্যস্ফীতি যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

দ্বিতীয় ধাপ : ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা কমলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে এবং কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হয়।

তৃতীয় ধাপ : বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট তৈরি হলে আমদানি ব্যাহত হয়, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়।

প্রাথমিকভাবে সাধারণ মানুষ এসব সমস্যাকে নিছক ‘অর্থনৈতিক সঙ্কট’ হিসেবে দেখে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যখন এর কোনো সুরাহা হয় না, তখন তারা বুঝতে

পারে যে এই সঙ্কটের মূলে রয়েছে ভুল নীতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ফলে জনমনে ক্ষোভ দানা বাঁধে এবং তারা সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করতে শুরু করে। এভাবেই একটি অর্থনৈতিক সঙ্কট একপর্যায়ে সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্কটে রূপ নেয়।

লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের ইতিহাস এর সাক্ষী। মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ধস ও মুদ্রার পতন শেষ পর্যন্ত গণ-অসন্তোষ, তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অবধারিতভাবে সরকার পতনের কারণ হয়েছে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিপজ্জনক চক্র

কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে দেশ একটি মারাত্মক দুষ্টচক্রে পতিত হয়। চক্রটি হয় এ রকম :- উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত -> ব্যাংকিং খাতে ঝুঁঁকি ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি -> লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ সঙ্কট -> প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ধস -> অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবিরতা -> ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষ -> চূড়ান্ত রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্কট।

এই চক্র একবার পূর্ণতা পেলে তা থেকে বের হওয়া যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

উত্তরণের পথ : বাংলাদেশের জন্য করণীয়

বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। এর অর্থ এই নয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্বাচিত সরকারের সমান্তরালে একটি ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ হয়ে উঠবে; বরং এর উদ্দেশ্য হলো, সম্পূণ পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, বিজ্ঞানসম্মত তথ্য ও জবাবদিহির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা।

এই মুহূর্তে করণীয় পদক্ষেপগুলো হলো

যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ : বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পদে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধেŸ ওঠে উচ্চমানের পেশাদার ও যোগ্য অর্থনীতিবিদদের নিয়োগ

দেয়া।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং : ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন ও তদারকিতে সব ধরনের রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাব সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

কঠোর আইনি পদক্ষেপ : বড় খেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো রকম অনুকম্পা না দেখিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ : রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের প্রকৃত তথ্য ও পরিসংখ্যান জনগণের সামনে নিয়মিত ও নির্ভুুলভাবে প্রকাশ করা।

শেষ কথা

রাজনীতি ও অর্থনীতি কখনোই একে-অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, এরা পরিপূরক। কিন্তু যখন সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেশাদার ও কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করে, তখন অর্থনীতি ভেতর থেকে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। আর একটি ভঙ্গুর ও পঙ্গু অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও গুঁড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির একটি শাশ্বত শিক্ষা হলো, একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যত বেশি স্বাধীন, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক হবে, সেই দেশের অর্থনীতি তত বেশি টেকসই হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাই টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই নির্মম সত্যটি অনুধাবন করা এবং তা বাস্তবায়ন করা এখন অপরিহার্য।