বন্ধ ৩ কূপে ফিরছে গ্যাস প্রকল্পে গতি ফিরবে কবে

আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে সরকার চারটি গ্যাসক্ষেত্রের সাতটি কূপে ওয়ার্কওভার (পুনঃসংস্কার) কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে তিনটি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় চার কোটি ১০ লাখ ঘনফুট (এমএমএসসিএফডি) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ২৭ মাসে বাস্তব অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪০.২৩ শতাংশ। বাকি ১৫ মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় সম্পন্ন করা না গেলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান এমআরআই অ্যাসোসিয়েটের প্রতিবেদনে।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • ২৭ মাসে ৪০ শতাংশ খরচে ৭ কূপ অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ
  • ৩ কূপে মিলছে ৪১ এমএমএসসিএফডি গ্যাস

আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে সরকার চারটি গ্যাসক্ষেত্রের সাতটি কূপে ওয়ার্কওভার (পুনঃসংস্কার) কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে তিনটি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় চার কোটি ১০ লাখ ঘনফুট (এমএমএসসিএফডি) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ২৭ মাসে বাস্তব অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪০.২৩ শতাংশ। বাকি ১৫ মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় সম্পন্ন করা না গেলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান এমআরআই অ্যাসোসিয়েটের প্রতিবেদনে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিল ও পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, ‘তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ এবং মেঘনা ফিল্ডে সাতটি কূপ ওয়ার্কওভার (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পটি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) বাস্তবায়ন করছে। প্রথম সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ৫২০ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের আওতায় বাপেক্সের মাধ্যমে সাতটি কূপে ওয়ার্কওভার করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটি প্রথমে ৫২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আড়াই বছরে অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুনে শেষ করার জন্য অনুমোদন প্রাপ্ত হয়। পরে ব্যয় তিন কোটি টাকা কমিয়ে মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।

প্রকল্প নেয়ার উদ্দেশ্য : প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা তিতাস-১৪, বাখরাবাদ-৬ ও ৭ এবং উৎপাদন ঝুঁঁকিতে থাকা তিতাস-৮ ও ১৬, হবিগঞ্জ-৫ ও মেঘনা-১ কূপসমূহে ওয়ার্কওভার সম্পাদনের মাধ্যমে উৎপাদন পুনরুদ্ধার ও সরবরাহ স্থিতিশীল করা। প্রকল্পের আওতায় ৭টি কূপ ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২.৫ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি দৈনিক প্রায় ৫.৫ থেকে ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হবে। ফলে মোট দৈনিক প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বজায় থাকবে। আর উপজাত হিসেবে দৈনিক প্রায় ৪৮ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর্থিকভাবে বিবেচনা করলে, আনুমানিক ১০ বছরে প্রায় ২৭৯ বিসিএফ গ্যাস ও ১.৬৭ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন প্রত্যাশিত, যা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারকরণে কার্যকর অবদান রাখবে।

তিন কূপে সাফল্য : প্রকল্প দলিল ও সমীক্ষা অনুযায়ী, তিতাস-১৬ কূপে ওয়ার্কওভার শেষে প্রতিদিন ১৩ এমএমএসসিএফডি গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়েছে। হবিগঞ্জ-৫ কূপে ৩৬ বছর পর ওয়ার্কওভার সম্পন্ন হওয়ার পর উৎপাদন ১৪ থেকে বেড়ে ২৮ এমএমএসসিএফডিতে পৌঁছেছে। মাত্র সাত মাসেই প্রায় ৬৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ উঠে এসেছে। অন্য দিকে তিতাস-১৪ কূপে কাজ শেষ হলেও রিজার্ভারের চাপ কমে যাওয়া এবং পানি প্রবেশের কারণে সেটি আবার বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাখরাবাদ-৭ কূপে কাজ চলছে। বাখরাবাদ-৬ ও মেঘনা-১ কূপের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির একটি অংশ দেশে পৌঁছেছে, বাকিগুলো এখনও আমদানির পথে রয়েছে।

আর্থিক অগ্রগতিতে ধীরগতি : আইএমইডির তথ্য বলছে, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২০৯ কোটি ২০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৪০.২৩ শতাংশ। বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৬৬ শতাংশ। অবশিষ্ট ১৫ মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হলে বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।

বিদেশী যন্ত্রপাতিতে বিলম্ব : সমীক্ষায় অংশ নেয়া কারিগরি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রযুক্তিগত নকশা বাস্তবসম্মত হলেও বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানিতে সময় বেশি লাগায় কাজ কিছুটা পিছিয়েছে। একই সাথে চলমান তিনটি কূপের সফলতা নির্ভর করছে বিশেষ ধরনের লগিং পরীক্ষার (ঈইখ-ঠউখ, ঈঅঝঞ-ঠ ও চঁষংব ঘবঁঃৎড়হ খড়ম) ফলাফলের ওপর।

নিরাপত্তা ও পরিবেশ : আইএমইডির প্রতিষ্ঠান এমআরআই অ্যাসোসিয়েট সরেজমিন পরিদর্শনে প্রতিবেদনে বলছে, সিমেন্টিং, লগিং ও কমপ্লিশন কাজে আন্তর্জাতিক মানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্লোআউট প্রিভেন্টার, চাপ পরীক্ষা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সন্তোষজনক। তবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহারে কিছু ঘাটতি রয়েছে। ব্যবহৃত মাড ও কেমিক্যাল পরিবেশসম্মতভাবে অপসারণ এবং পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সমীক্ষায় প্রকল্পটির শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কূপ খননের তুলনায় কম ব্যয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার এবং অভিজ্ঞ জনবল। অন্য দিকে দুর্বলতা হিসেবে রয়েছে পুরনো কূপে কাজের ঝুঁঁকি, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ফলাফল অনিশ্চয়তা। একই সাথে রিজার্ভার ক্ষয়, কূপের কাঠামোগত সমস্যা এবং পরিবেশগত ঝুঁঁকিকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইএমইডির সুপারিশ : এমআরআই অ্যাসোসিয়েটের মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনের তথ্যে আলোকে আইএমইডি বলছে, অবশিষ্ট সময়ে পাক্ষিক ভিত্তিতে অগ্রগতি পর্যালোচনা, জিডিএফ তহবিল দ্রুত ছাড়, বিদেশী যন্ত্রপাতির শিপমেন্ট ও শুল্কায়ন ত্বরান্বিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাখরাবাদ ও মেঘনা ফিল্ডের বাকি কূপে বড় বিনিয়োগের আগে লগিং পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এলএনজি আমদানি স্বল্পমেয়াদি সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় কূপে ওয়ার্কওভার ও নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ।