ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় দীর্ঘদিনের পড়ে থাকা পতিত ও অনাবাদি জমিতে নতুন সম্ভাবনার আলো জ্বলতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ সঙ্কট ও লোডশেডিংয়ে নাকাল এই জনপদে ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুতের ঘাটতি কমাবে না, বরং এলাকায় নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে ‘জুলস পাওয়ার লিমিটেড’। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘মুক্তাগাছা সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড (এমএসইএল)’ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটি দেশের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।
মুক্তাগাছা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্র জানায়, শীত মৌসুমে উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩০ মেগাওয়াট হলেও গ্রীষ্মে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ মেগাওয়াটে। বর্তমানে মোট চাহিদার মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। এমএসইএলের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার নিমুরিয়া গ্রামের প্রায় ৭৪ একর জলাবদ্ধ ও দুর্গম জমিতে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। বছরের পর বছর কচুরিপানা ও আগাছায় ঢাকা এসব জমি কৃষিকাজ বা অন্য কোনো উৎপাদনমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। ২২ বছরের জন্য বার্ষিক লিজের ভিত্তিতে জমিগুলো নেওয়া হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জমি ভরাট না করে পিলারের ওপর সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে। ভাসমান ফ্লোটারের মাধ্যমে কেবল সংযোগ স্থাপন করে নির্মিত এই সৌরকেন্দ্রটি চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটি বছরে প্রায় ৩৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং প্রায় ২৪ হাজার ৩৪৪ টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
জুলস পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মো. মেহেদুল ইসলাম জানান, এই পতিত জমিগুলো থেকে এতদিন জমির মালিকরা কোনো আর্থিক সুবিধা পেতেন না, বরং ভূমি উন্নয়ন কর ছিল তাদের জন্য বাড়তি চাপ। এখন তারা নিয়মিত লিজের অর্থ পাচ্ছেন। বর্তমানে দুই শতাধিক স্থানীয় মানুষ নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কমবে, জনজীবনে ফিরবে নিরাপত্তা ও স্বস্তি।’
জমির মালিক আব্দুল মালেক বলেন, জলাশয়ের মধ্যে আমার জমি ছিল, কোনো কাজে লাগত না। এখন লিজ দেয়ায় নিয়মিত আয়ের একটি উৎস তৈরি হলো। এটি আমার পরিবারের জন্য বড় স্বস্তি।
রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক মাহাবুবুল আলম কাজল বলেন, দশকের পর দশক জমি অনাবাদি ছিল। এখন এই জমি থেকেই সংসারের খরচে কিছুটা কাজে লাগবে।
গত বছরের ডিসেম্বরে এডিবি এমএসইএলের সাথে দুই কোটি ৪৩ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি সই করে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি সরাসরি দিয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার এবং এলইএপি-২ তহবিল থেকে এসেছে ৮৮ লাখ ডলার। এডিবির বেসরকারি খাত অপারেশনের পরিচালক সুজান গ্যাবরি বলেন, এই অর্থায়ন বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে।
এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ১২ পয়সা দরে গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। জানা যায়, বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৪.৫ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুক্তাগাছার এই প্রকল্প সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি বাস্তব ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।



