নির্বাচন-পরবর্তী উচ্ছ্বাসে পুঁজিবাজারে রেকর্ড উত্থান

Printed Edition

নাসির উদ্দীন চৌধুরী

  • বিএনপি জোটের জয়ের পর সূচক ২০০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি
  • একদিনে বাজারমূলধনে যোগ ১২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের বিজয়ের পর দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় উত্থান দেখা গেছে। লেনদেন শুরুর দুই মিনিটের মধ্যেই দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ১৫২ পয়েন্ট উন্নতি করে। প্রথম দশ মিনিটে লেনদেন দাঁড়ায় ১৪০ কোটি টাকায়, যা এক ঘণ্টায় বেড়ে হয় ৪২০ কোটি টাকা। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থা সৃষ্টি করেছে, দিনের বাজার আচরণে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

গতকাল লেনদেনের সূচনা ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। প্রথম দুই মিনিটেই ডিএসইর প্রধান সূচক ১৫২ পয়েন্ট উন্নতি করে। পরবর্তীতে মৃদু বিক্রয়চাপ দেখা দিলেও দিনশেষে সূচকটি ২০০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে যায়। নির্বাচন-পূর্ব পাঁচ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট থেকে দিনশেষে সূচক দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৬০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। একই সময়ে ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচক যথাক্রমে ৮৬ দশমিক ১৮ ও ৩০ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট উন্নতি করে।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচক যথাক্রমে ৪৯৬ দশমিক ৪৬ ও ২৮২ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট উন্নতি করে। দুই পুঁজিবাজারেই একদিনে তিনটি সূচকের এ উত্থান সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সব সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতির রেকর্ড গড়েছিল পুঁজিবাজার। ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কয়েকদিন সূচক ও লেনদেনে বড় উত্থান দেখা গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

সূচকের উন্নতির প্রভাব পড়ে লেনদেনেও। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে মোট লেনদেন হয় এক হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। নির্বাচন-পূর্ব শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৯০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন দাঁড়ায় ২৪ কোটি টাকায়, যেখানে আগের দিন ছিল ৯ কোটি টাকা।

সূচক বৃদ্ধির ফলে ডিএসইর বাজারমূলধনেও বড় অঙ্কের সংযোজন ঘটে। আগের দিনের সাত লাখ আট হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা থেকে দিনশেষে বাজারমূলধন দাঁড়ায় সাত লাখ ২১ হাজার ২৮২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ একদিনেই বাজারমূলধনে যোগ হয়েছে ১২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, “গতকালের বাজার আচরণ ছিল পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন। বিএনপি সরকারের সময় পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছিল। দীর্ঘ দিন পর দলটি আবার ক্ষমতায় ফিরেছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।”

পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান উল্যা নয়া দিগন্তকে বলেন, “সূচকের উন্নতির পাশাপাশি লেনদেনের যে চিত্র দেখা গেছে, তা বিনিয়োগকারীদের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।” এ প্রবণতা টিকে থাকবে কি না- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “লেনদেনের ভলিউম প্রমাণ করে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে এ ধারা অব্যাহত থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।” বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যারা লোকসানে রয়েছেন তারা পোর্টফোলিও ভারসাম্য আনার চেষ্টা করতে পারেন। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মৌলভিত্তি বিবেচনায় নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

গতকালের বাজার আচরণের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, নির্বাচনে জয়ী জোটের সাথে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে বেশি উত্থান দেখা যায়। ব্যাংক ও বীমা খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল। অন্যদিকে ইবনে সিনা ও ইসলামী ব্যাংকের মতো কিছু কোম্পানি দরপতনের মুখে পড়ে।

ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক। ৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির দুই কোটি ৮১ লাখ ৩১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ৪২ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় এক কোটি ৮৭ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার লেনদেন করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা ব্যাংক। এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ দশে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, রবি আজিয়াটা, সায়হাম কটন মিলস, যমুনা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ওরিয়ন ইনফিউশন।