মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ভারত নেপালিদের দখলে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পরিস্থিতির পেছনে বাংলাদেশী কর্মীদের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নেতিবাচক প্রচারণা এবং নানাবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। প্রবাসীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশীদের দ্বারা সংঘটিত যেকোনো ছোটখাটো অপরাধের ঘটনাকেও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত বড় করে (হেডলাইন করে) প্রচার করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিয়োগকর্তাদের মনে বাংলাদেশী কর্মীদের সম্পর্কে একটি স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

মনির হোসেন
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শ্রমবান্ধব দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজার এখন ভারত ও নেপালের কর্মীদের ‘দখলে’ চলে যাচ্ছে। এমন গুরুতর অভিযোগ ও আশঙ্কার কথা জানিয়ে সচেতন প্রবাসী বাংলাদেশীরা বলছেন, আগে মধ্যপ্রাচ্যের কনস্ট্রাকশন ও সার্ভিস সেক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশী কর্মীদের ব্যাপক আধিক্য ও চাহিদা ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেসব পদের সিংহভাগই ভারত ও নেপালি নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পরিস্থিতির পেছনে বাংলাদেশী কর্মীদের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নেতিবাচক প্রচারণা এবং নানাবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। প্রবাসীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশীদের দ্বারা সংঘটিত যেকোনো ছোটখাটো অপরাধের ঘটনাকেও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত বড় করে (হেডলাইন করে) প্রচার করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিয়োগকর্তাদের মনে বাংলাদেশী কর্মীদের সম্পর্কে একটি স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

তীব্র দাবদাহ ও কুয়েতের শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি

সম্প্রতি কুয়েত সিটি থেকে ‘কেবিই এক্সচেঞ্জ’-এর হাসাবিয়া শাখার ব্যবস্থাপক আ ক ম আজাদ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে নয়া দিগন্তকে জানান, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের এখনই এই বিষয়গুলোতে জরুরি নজর দেয়া উচিত। কুয়েতের বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কুয়েতের তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। তীব্র গরমের কারণে কুয়েত সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারবে না।’

এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যেসব বাংলাদেশী কর্মী কুয়েতের রাস্তায় দিনমজুর (ডে লেবার) হিসেবে, ছোট ছোট দোকানে কিংবা বিভিন্ন নির্মাণাধীন (কনস্ট্রাকশন) এলাকায় কাজ করতেন, তাদের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছেন। আকস্মিক কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাদের নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর হারে। প্রবাসীদের আয় কমে যাওয়ায় বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠানোর পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে আ ক ম আজাদ বলেন, প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে প্রবাসী বাংলাদেশীরা কোরবানি ও পরিবারের খরচের জন্য সাধারণত বেশি পরিমাণ টাকা দেশে পাঠান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সে সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ঈদ-পরবর্তী সময়ে প্রবাসীদের হাতে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত টাকা না থাকায় গত জুন মাসে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার এমনিতেই কমতির দিকে ছিল। এর ওপর আবার যোগ হয়েছে তীব্র গরমে কর্মীদের বেকার হয়ে পড়ার ঘটনা। তিনি উল্লেখ করেন, এই চিত্র শুধু কুয়েতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই বর্তমানে একই ধরনের সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

ভারত ও নেপালের কাছে বাজার হারানোর নেপথ্য কারণ

মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপক আজাদ আরো জানান, কুয়েতে অতীতে বাংলাদেশী কর্মীরা বিভিন্ন নামী স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল এমনকি সরকারি মিনিস্ট্রিগুলোতেও দাপটের সাথে কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই স্থানগুলো সম্পূর্ণভাবে ভারত ও নেপালি কর্মীদের দখলে চলে গেছে।

বাংলাদেশী শ্রমবাজার হাতছাড়া হওয়ার প্রধান কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দুটি মূল বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন : প্রথমত, অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়। একজন বাংলাদেশী কর্মীকে কুয়েতে আসতে ভিসা ও আনুষঙ্গিক বাবদ প্রায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। এর বিপরীতে ভারত এবং নেপালের কর্মীদের অভিবাসনব্যয় বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। নেপালি কর্মীরা বাংলাদেশ টাকায় মাত্র এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে কুয়েতে চলে আসতে পারেন। অন্যদিকে, ভারতীয় কর্মীদের কুয়েতে আসার জন্য কোনো ভিসা কিনতে হয় না, তাদের মূলত ‘ফ্রি ভিসা’ দেয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের অপপ্রচার ও বৈষম্য। কুয়েতের স্থানীয় মিডিয়াগুলোর সিংহভাগ কর্মচারী, স্টাফ এবং নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভারতীয় নাগরিক। তারা পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার জন্য ছোটখাটো অপরাধকেও ফলাও করে প্রচার করে। উদাহরণ দিয়ে আজাদ বলেন, কোনো একটি অপরাধের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা শিরোনাম করে- ‘১ জন বাংলাদেশীসহ ১৯ জন আরবি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে’। অর্থাৎ, ১৯ জন আরবির মধ্যে মাত্র একজন বাংলাদেশী থাকলেও, তারা কৌশলে বাংলাদেশীকে সামনে এনে হেডলাইন তৈরি করে। এভাবে সূক্ষ্ম প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশী কর্মীদের বড় অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশী কর্মীদের আকামা (বসবাস ও কাজের অনুমতিপত্র) নবায়নসহ নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তো বছরজুড়েই লেগে থাকে। প্রবাসীদের মতে, এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখা উচিত।

নারী গৃহকর্মী উদ্ধার ও বিএমইটির ভূমিকা

গত সপ্তাহে কুয়েত থেকে সাতজন নির্যাতিত বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনা প্রসঙ্গে আ ক ম আজাদ প্রশ্ন তোলেন, ‘এই নারী কর্মীরা বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রয়োজনীয় সত্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) ছাড়া কিভাবে কুয়েতে আসার অনুমতি পেল? ঢাকার জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তাদের বহির্গমন ছাড়পত্র কিভাবে দিলো?’

তিনি অভিযোগ করেন, এই নারী কর্মীদের কুয়েতে আসা এবং পরবর্তীতে নির্যাতিত হয়ে ফেরত যাওয়ার পেছনে বিএমইটির কোনো না কোনো অসাধু কর্মকর্তার নিশ্চিত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (বহির্গমন) তাজিম উর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিএমইটির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে প্রতিটি দেশের ভিসা অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে তবেই বহির্গমন অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।

তা সত্ত্বেও, নামকরা বেশির ভাগ রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের অভিযোগ-বিএমইটিতে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট বা চক্র অসত্যায়িত ভিসার বিপরীতে বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়ার জন্য টেবিলের নিচে (ঘুষের মাধ্যমে) মাঝে মধ্যে কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে ‘আন্ডারহ্যান্ডলিং’ বা গোপন লেনদেন করে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতামত : দক্ষ জনশক্তির অভাব ও ইমেজ সঙ্কট

অভিবাসন বিশ্লেষক ও জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন ‘বায়রা’-র সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ভারত ও নেপালের দখলে যাওয়া প্রসঙ্গে কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই এই বাজার দখলের কথা বলে থাকেন, তবে ঢালাওভাবে ভাবলে এটি একটি ‘রং কনসেপ্ট’ (ভুল ধারণা)। মূলত ভারত ও নেপাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ‘সেমি-স্কিলড’ (আধা-দক্ষ) এবং প্রফেশনাল (পেশাজীবী) কর্মীরা বেশি যান। আর আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে মূলত শুধু ‘আনস্কিলড’ বা সাধারণ লেবার শ্রেণীর কর্মী।’

তিনি আরো ব্যাখ্যা করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকার যখন শ্রমভিসা ইস্যু করে, তখন তারা একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা রেসিও (অনুপাত) বজায় রাখে। এটি সম্পূর্ণভাবে ওই সব দেশের সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি। বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির চরম অভাব রয়েছে। অদক্ষ লোক বিদেশে পাঠালে অভিবাসন খরচ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। যখন বাংলাদেশ থেকে দক্ষ লোক যাওয়া শুরু করবে, তখন আসার খরচ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে যাবে এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর হারও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান এটি স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশী কর্মীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। আর এই সুযোগটিকে পুঁজি করেই মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক অপপ্রচার চালানো হয়, যা আমাদের জাতীয় ইমেজ সঙ্কটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের অপপ্রচারকে আমাদের দূতাবাসগুলোর ‘প্রেস উইং’ থেকে অবশ্যই আইনি ও কূটনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা উচিত।

দূতাবাসের ভূমিকা ও প্রবাসীদের ক্ষোভ

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর বিভাগের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কৌশলে মূল প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে সাধারণ প্রবাসী কর্মীদের দাবি, কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে সাধারণ প্রবাসীরা পাসপোর্ট নবায়ন থেকে শুরু করে নানা ধরনের সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার হন। কিন্তু দূতাবাসের এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তেমন কোনো কার্যকর মনিটরিং বা নজরদারি করা হয় না।

অবশ্য প্রবাসীরা এও উল্লেখ করেন যে, মাঝে মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাস বেশ তৎপর ভূমিকাও পালন করে। যেমন-সাম্প্রতিক সময়ে ওই সাতজন নারী গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের বিষয়টি জানতে পেরে দূতাবাস কুয়েত প্রশাসনের সহায়তায় তাদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ শরীরে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রশংসনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।