স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত হচ্ছে অপরাধ জগৎ

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

  • ভাড়াটিয়া কিলারদের হাতে খুন হচ্ছে নেতাকর্মীরা
  • ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে গডফাদাররা

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের অপরাধ জগৎ। রাজনৈতিক মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়াটিয়া কিলারদের। এসব কিলারদের টার্গেট ও চোরাগুপ্তা হত্যার শিকার হচ্ছেন একের পর এক নেতাকর্মী। আহত হচ্ছেন অনেকেই। শুধু তাই নয়, এলাকায় নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই রাজনৈতিক নেতাদের আহবানে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করছেন। তবে বরাবরের মতোই ধরাছোঁওয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন সুবিধাভোগী গডফাদাররা। গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর মিরপুরে দুর্বৃত্তের এলোপাতাড়ি গুলিতে খুন হন যুবদলের কর্মী ইউসুফ। এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে সরব হয়ে উঠেছেন স্থানীয় যুবদলের নেতারা। তাদের দাবি আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদকে ঘিরে ঘটেছে এই হত্যাকাণ্ড। প্রতিপক্ষকে দুনিয়া থেকে সরাতে ভাড়াটিয়া কিলার দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন যুবদলের নেতারা। গত ২৯ তারিখ ঢাকার সেগুনবাগিচার বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে সংবাদ সম্মেলন করেন কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপোষণে এই হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ইউসুফ নয়, তিনিই ছিলেন মূল টার্গেট। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। তার দাবি, ওই ঘটনায় কাফরুল থানার বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেয়ান জনি মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা। আবির, হাফিজ, জিয়ারুল এই তিন ঘাতকের সাথে সাব্বির দেওয়ান জনির ছবি পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব বের হয়ে আসবে।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন নিহত হন কাফরুল থানা যুবদলের কর্মী ইউসুফ এবং গুলিতে গুরুতর আহত হন আরো দুজন। তার দাবি, ওই হামলার মূল লক্ষ্যই ছিলাম আমি। আমাকে চিরতরে সরিয়ে দিতে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে শুটার নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে আমি কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করাই আমার ও আমার সহকর্মীদের জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারি, সেই উদ্দেশ্যে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আমাকে হত্যার নীল-নকশা তৈরি করা হয়। মূল চক্রান্তকারী নিজে আড়ালে থেকে কিলিংমিশন পরিচালনা করেছে। মূল ঘটনা ও অপরাধীদের আড়াল করতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের গল্প সাজিয়ে পুরো বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এর পর দিনই একই যায়গায় পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনি। তিনি দাবী করেন, কাউন্সিলর নির্বাচনকে সামনে রেখে ভাড়াটিয়া খুনি দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর দায় চাপানোর অবৈধ চেষ্টা করছে সুবিধাবাদীরা। তারা খুন, হামলা, মিথ্যা মামলা দিয়ে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত এই ঘটনার সাথে কোনোভাবেই তার সম্পৃক্ততা নেই।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ছয় মাসে রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক। শুধু ১৮ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই এর মধ্যে ঢাকায় ইউসুফ ছাড়াও ভাসানটেকে কাউসার মোল্লা, সবুজবাগে ইব্রাহীম পলাশ এবং হাজারীবাগে সাগর আহমেদ নামে এক যুবক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ইব্রাহীম পলাশের দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে যায় খুনিরা। হত্যাকাণ্ডের বড় অংশই ঘটেছে চুক্তিভিত্তিক শুটারদের প্রকাশ্য ও চোরাগুপ্তা হামলায়। রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, ভাসানটেক, কাফরুল, বাড্ডা, সবুজবাগ এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় এই কিলারদের মুভমেন্ট সবচেয়ে বেশি।

সূত্র মতে, এসব হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের বেশির ভাগই আসছে প্রতিবেশী দেশ থেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ সীমান্ত গলে দেশে প্রবেশ করে। ধারণা করা হয় ১৭ থেকে ৩০টি রুট ব্যবহার করে অস্ত্র আসছে। এর মধ্যে কিলারদের কাছে থাকা ছোট আগ্নেয়াস্ত্র মূলত প্রতিবেশী ভারত থেকে যশোরের বেনাপোল, শার্শা, চৌগাছা এবং দর্শনা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অরক্ষিত সীমান্তপথ অস্ত্র চোরাচালানের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট। রাজশাহী ও নওগাঁ হয়ে এগুলো সারা দেশে ছড়ায়। এ ছাড়া মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরাম সীমান্ত হয়ে ভারী অস্ত্র, সাব-মেশিনগান এবং হ্যান্ড গ্রেনেড টেকনাফ ও উখিয়া রুট দিয়ে প্রবেশ করে।

গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।