সাহাবুদ্দিনকে আরো এক বছর রাষ্ট্রপতি রাখতে চায় বিএনপি!

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনকে অন্তত আরো এক বছর এই পদে বহাল রাখতে চায় বিএনপি। দলের একাধিক নেতার কাছ থেকে এমনই মনোভাব পাওয়া গেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এখনই তাকে পদচ্যুত করে নিজেদের কোনো লোককে রাষ্ট্রপতি বানালে সংসদের মেয়াদ এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদ সমান হবে। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের লোক থাকবে না। সাহাবুদ্দিনকে এক বছর পর সরিয়ে নিজেদের লোককে রাষ্ট্রপতি বানালে সংসদের মেয়াদ শেষ হলেও রাষ্ট্রপতি নিজের পদে বহাল থাকবেন। তারা আরো বলছেন, যেহেতু আগামী নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, তাই রাষ্ট্রপতি নিজেদের লোক হলে নির্বাচনসহ প্রশাসনে একটু হলেও বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। তা ছাড়া বিএনপির ৩১ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনেকখানি বাড়ানোর কথা। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা রাষ্ট্রপতির পক্ষে আরেকটু সহজ হতে পারে।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছর মেয়াদে রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্বে আসেন মো: সাহাবুদ্দিন। ফলে তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু মেয়াদ রয়েছে, সেখানে মো: সাহাবুদ্দিন যদি পদত্যাগ না করেন অথবা তাকে অভিশংসন বা অপসারণ না করা পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনগত সুযোগ নেই। অভিশংসন বা অপসারণ করতে হলে বর্তমান সরকারকেই সেই উদ্যোগ নিতে হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র মতে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন প্রশ্নে নানা আলোচনা চলছে রাজনীতিতে। এমনকি বিএনপির কারা রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, অনেক নাম দিয়েও খবর হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমেও রয়েছে অনেক নাম নিয়ে আলোচনা। দলটির নেতাকর্মীদেরও অনেকে ধারণা করছেন, রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে। ফলে সংবিধান অনুযায়ী এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয় নেই। তারা বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন না।

সূত্র মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ও পরে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিতর্কিত ভূমিকা, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে তার অপসারণের দাবিতে সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলাচনার সৃষ্টি করেছে। মূলত শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন বলে রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট জানালেও পরে সেই পদত্যাগপত্র খুঁজে না পাওয়ার কথা বলে তিনি সাংবিধানিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দেন। যদিও এর আগেই ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিল।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান এই রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ও ‘খুনির দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন যে, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। পরবর্তী সময়ে দু’টি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। নতুন গল্প সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন। তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকার নৈতিক কোনো অধিকার নেই।

রাষ্ট্রপতি যে আপাতত থাকছেন তা তার বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমার দুঃসময়ে বিএনপির শতভাগ সহযোগিতা ছিল। তারা সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাৎকারে তিরি আরো বলেছিলেন, আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আমার পাশে ছিল। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল; কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল!

এ দিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে এবং পরে আরো দু-একটি অনুষ্ঠানে নতুন প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে একসাথে বেশ খোশমেজাজে দেখে অনেকেই বলছেন, দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান রাষ্ট্রপতির ওপরই আপাতত আস্থা রাখছে বিএনপি এটা নিশ্চিত। রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি বলেছেন বিএনপি চাইলে থাকব, না চাইলে চলে যাবো। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন? এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই আন্দোলনকে স্বীকৃতি প্রদান, হাসিনার ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন নিয়ে তাকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। সবমিলিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে পরিবর্তনের প্রশ্নে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলেই একাধিক নেতা নিশ্চিত করেন।

সূত্র মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রপতির পদে বিএনপি নতুন কাউকে নির্বাচিত করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভবিষ্যতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে। দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া বা একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, দলের প্রধান ও সংসদ নেতা যাতে না হন এমন কিছু সংস্কারে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। প্রধান বিচারপতি, সেনাবাহিনী প্রধানসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ বা ভারসাম্যের বিষয়টিও রয়েছে। এসব বিষয় সামনে রেখে বিএনপি এই মুহূর্তে নতুন কাউকে রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচিত করতে আগ্রহী নয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর সেই আন্দোলনের নেতৃত্বের বড় একটা আংশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি তুলেছিল। সে সময় সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা উল্লেখ করে বিএনপি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবির বিপক্ষে। তখন তাদের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেয়া হলে দেশে সংবিধান ও আইনবহির্ভূত একটা অরাজকতা বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা জানান, বিএনপি এবং তাদের সরকার এখন পর্যন্ত সংবিধান সমুন্নত রাখার পুরনো অবস্থানেই আছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি দলীয় ফোরামেও আলোচনা হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি সরকার এখনই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের পথে যাচ্ছে না এবং পরিবর্তন করতে চাইলে সে জন্য সময় নেবে। তারা বলছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে বিএনপি সরকার তাদের যাত্রার প্রথম পর্যায়ে সংসদ গঠন করাসহ সাংবিধানিক কাজগুলো সেরে নিতে চাইছে। একই সাথে সংবিধান সমুন্নত রাখার যে কথা দলটি বলে আসছে, সেই অবস্থানে থাকার ব্যাপারেও একটা বার্তা দেয়া হচ্ছে বিরোধীদের প্রতি।