আইপিওকে আরো বাজারবান্ধব করার উদ্যোগ বিএসইসির

চার দিন টানা উন্নতির পর পুঁজিবাজারে সংশোধন

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে স্বাভাবিক সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। এর আগে বাজারে বিভিন্ন খাতে সংশোধন ঘটলেও প্রতিদিনই দেশের দুই পুঁজিবাজারে সবগুলো সূচক কমবেশি উন্নতি ধরে রাখে। বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষদিন তাই সংশোধনের এ ঘটনা ঘটে। দুই বাজারেই প্রায় সবগুলো খাতে মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। এ দিন লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে ছিল বাজারগুলো। পরবর্তী সময়ে বেশ ক’বার ঘুরে দাঁড়ানেরার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। দিনশেষে উভয় বাজারেই সবগুলো সূচকের অবনতি ঘটে। লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডের বেশির ভাগ দর হারানোর পাশাপাশি অবনতি ঘটেছে বাজারগুলোর লেনদেনেরও।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৫ দশমিক ৯১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজর ৯২৬ দশমিক২৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৯০০ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ২৭ ও ২ দশমিক০৮ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৫৫ দশমিক ০৪ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ১৫ হাজর ৮৬৯ দশমিক ৮১ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি এ দিন লেনদেন শেষে ১৫ হাজার ৮১৪ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে স্থির হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৭৬ দশমিক ২৩ ও ৩৮ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট।

সংশোধনের ফলে গতকাল দুই বাজারেই বড় অবনতি ঘটে লেনদেনের। এ দিন ডিএসই এক হাজার ১১৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৯৭ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেন নেমে আসে ১৮ কোটি টাকায়, যা আগের দিন অপেক্ষা ১৪ কোটি টাকা কম। বুধবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৩২ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা লেনদেনের এ অবনতির কারণ হিসেবে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির কথাই বলছেন। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন কমবেশি পরিপক্বতা এসেছে। তারা মনে করছেন, মুনাফা তুলে নেয়ার অংশ হিসেবেই এ সংশোধন। সংশোধন শেষ করে বাজার আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে। তাই বিক্রয়চাপ খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি তাদের। সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী সংশোধন শেষ করে আবার স্বাভাবিক আচরণে ফিরবে পুঁজিবাজার।

এ দিকে পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ সময় আইপিও-সংক্রান্ত বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীা, আবেদন প্রক্রিয়া, আইপিও প্রাইসিং, ডিরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সাথে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও আইনগত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে কমিশন।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল এ সংক্রান্ত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংস্থাটি। সভায় বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পাশাপাশি কমিশনের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি), বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ), সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশ, বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক, ইস্যু ম্যানেজার এবং পুঁজিবাজারের অন্যান্য অংশীজনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

সভায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫-এর আলোকে আইপিও-সংক্রান্ত আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত, নিরীা কার্যক্রম এবং আইপিও আবেদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। একই সাথে নিরীক (অডিটর), ইস্যু ম্যানেজার ও ইস্যুয়ারদের ভূমিকা, দায়িত্ব এবং জবাবদিহিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এ ছাড়া আইপিও প্রাইসিং, পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটির তালিকাভুক্তি, ডিরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যুসহ পুঁজিবাজারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা আইপিও প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান বাস্তব সমস্যা, চ্যালেঞ্জ এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্ভাব্য সংস্কার বিষয়ে মূল্যবান সুপারিশ উপস্থাপন করেন।

বিএসইসি জানায়, সভায় উপস্থাপিত মতামত ও সুপারিশ কমিশন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে এবং আইপিও প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগকারীবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও আইনগত সংস্কারের পদপে নেয়া হবে। সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান, কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, সিপিএ, কমিশনার নাহিদ মাহতাব এবং কমিশনার মো: নাফিজ আল তারিক, সিএফএ, এফআরএম।

গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি টেকনোড্রাগস। ৪৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি তিন লাখ ৯০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩৫ কোটি চার লাখ টাকায় ৬৬ লাখ ১৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, ফারইস্ট নিটিং, লাভেলো আইসক্রিম, লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ, ব্র্যাক ব্যাংক, বাংরাপদেশ শিপিং করপোরেশন, সিটি ব্যাংক ও নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস।