নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক চরম উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং গ্রামীণ অবক্ষয়ের কারণে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সরকারি ও গণমাধ্যমের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র আড়াই মাসেই দেশে ১২৭ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৫৫ জন। আবহাওয়া ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাক-মৌসুমি এই সময়ে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধির ফলে খোলা মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দেশের তিন জেলায় বজ্রপাতের তাণ্ডবে আরো সাতজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরো একজন। এর মধ্যে গতকাল নেত্রকোনায় তিনজন, সিলেটে দু’জন এবং গত বুধবার ফেনীতে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
কেন বাড়ছে মৃত্যু
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতদের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষই গ্রামীণ এলাকার কৃষক এবং জেলে, যারা খোলা মাঠে বা হাওরে কাজ করার সময় সরাসরি এর শিকার হন। সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাত ও প্রাণহানি বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তন : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বজ্রপাতের আশঙ্কা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ে, যা মেঘের ভেতরে তীব্র ঘর্ষণ তৈরি করে দ্রুত বজ্রপাত ঘটায়।
উঁচু গাছের বিলুপ্তি : অতীতে গ্রামীণ অঞ্চলে থাকা তালগাছ, বটগাছ বা নারিকেল গাছের মতো উঁচু গাছগুলো প্রকৃতির ‘লাইটনিং রড’ হিসেবে কাজ করত এবং বজ্রপাতকে সরাসরি মাটিতে টেনে নিত। এসব গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলায় বজ্রপাত এখন সরাসরি খোলা মাঠে বা মানুষের ওপর পড়ছে।
বায়ুদূষণ : কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া বাতাসে ধূলিকণা এবং কার্বনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী ধূলিকণা ও ক্ষতিকারক সালফেট কণার এই আধিক্য মেঘে আধান (চার্জ) জমার প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করছে।
গ্রীষ্মকালে তীব্র গরমে বাষ্পীভূত জলীয় বাষ্প ওপরে উঠে ঠাণ্ডা হয়ে ‘কিউমুলোনিম্বাস’ নামক বিশালাকার কালো মেঘ তৈরি করে। মেঘের ভেতরের তীব্র বাতাসে বরফকণা ও পানির ফোঁটার ঘর্ষণে ভারী কণাগুলো ঋণাত্মক (নেগেটিভ) আধান নিয়ে মেঘের নিচে এবং হালকা কণাগুলো ধনাত্মক (পজিটিভ) আধান নিয়ে ওপরে জমা হয়। মেঘের নিচের তীব্র নেগেটিভ আধানের আকর্ষণে ভূপৃষ্ঠে একটি শক্তিশালী পজিটিভ আধানের সৃষ্টি হয়, যা দুইয়ের সংযোগে বজ্রপাত ঘটায়।
সরকারি হিসাবমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে বজ্রপাতে তিন হাজার ৮৩৫ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যেখানে প্রতি বছর গড়ে মৃত্যু হচ্ছে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের।
তিন জেলায় নিহত ৭
নেত্রকোনার কেন্দুয়া সংবাদদাতা জানান, নেত্রকোনার হাওরবেষ্টিত দুই উপজেলায় মাছ ধরতে গিয়ে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে কেন্দুয়া ও মদন উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের সোনালী মিয়ার ছেলে ও ইটভাটা শ্রমিক রাজীব মিয়া (২৪), কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের দিগলি গ্রামের শামসুল হুদা (৫৫) এবং একই উপজেলার ডাউকি গ্রামের আশরাফুল ইসলাম (২৫)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভোরে বৃষ্টির সময় মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের গণেশের হাওরে বাঁশের তৈরি বাইর/দোয়ারি থেকে মাছ তুলতে গিয়ে রাজীব মিয়া বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত রাজীবের স্ত্রী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আট সদস্যের পরিবারটি একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়েছে। মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। একই দিন কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে ও সান্দিকোনা গ্রামের খালপাড়ে মাছ ধরতে গিয়ে কৃষক শামছুল হুদা ও আশরাফুল ইসলাম বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। কেন্দুয়া ও মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সিলেট ব্যুরো জানান, নগরীর অদূরে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বাঘমারা হাল হাওরে (গয়াসি হাওর) বড়শিতে মাছ শিকার করতে গিয়ে বজ্রপাতে দুই মৎস্যজীবী নিহত ও একজন নিখোঁজ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে ফেঞ্চুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বাঘমারা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কামালপুর (কালারবাজার) গ্রামের ছাবির আহমদ (৪০) ও হামিদ মিয়া (৪৫)। তারা হাওরে বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের সময় বজ্রপাতের শিকার হন। ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির জানান, ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ থাকা অপর ব্যক্তির নাম-ঠিকানার সন্ধান ও তাকে উদ্ধারে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ফেনী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার পৃথক স্থানে বৃষ্টির সময় বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে আকস্মিক বজ্রপাতে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে ফেনীর ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় এই ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো- ফুলগাজী উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের মো: শহীদের মেয়ে ও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাদিয়া আক্তার (৯) এবং ছাগলনাইয়া উপজেলার পূর্ব দেবপুর গ্রামের মো: আরিফের ছেলে আবির হোসেন (৭)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ফুলগাজী থানার ওসি এস এম মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।



