ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
সরকারি প্রকল্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের অনাপত্তি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অনুমোদিত নকশাসহ প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক অনুমোদন থাকার পরও নীলক্ষেত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ শুরু করা যাচ্ছে না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, নীলক্ষেত হাইস্কুলের আপত্তি ও বাধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবনেই গাদাগাদি করে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে শত শত শিক্ষার্থীকে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গার ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধই ভবন নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ দেয়া ৫৭ দশমিক ৯২ শতাংশ জমির ওপর নীলক্ষেত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে নীলক্ষেত হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবহৃত জমির বড় অংশ হাইস্কুলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দখলে রয়েছে মাত্র ২৩ দশমিক ২৯ শতাংশ জমি। দুই প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রবেশপথও অভিন্ন এবং সেটির নিয়ন্ত্রণও হাইস্কুলের হাতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সন্তানদের পাশাপাশি আশপাশের নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুরাও বিনাবেতনে পড়াশোনা করে।
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে একই স্থানে ছয়তলা নতুন ভবন নির্মাণে অনাপত্তি দেয়া হয়। অন্য দিকে নীলক্ষেত হাইস্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৮৩ সালে সিন্ডিকেটের একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জমি ব্যবহারের বিষয়টি নির্ধারিত ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক একাধিক সিন্ডিকেট সদস্যের মতে, সিন্ডিকেটের সর্বশেষ সিদ্ধান্তই কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ২০২৫ সালের সিদ্ধান্তই বহাল রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সর্বশেষ সিদ্ধান্তই কার্যকর থাকে। সে অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে ২০২৫ সালের অনাপত্তিই বলবৎ রয়েছে।’ প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সম্প্রতি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলে নীলক্ষেত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষক শ্রমিকদের কাজে বাধা দেন। এ ঘটনার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন এবং অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির উপস্থিতিতে এলজিইডি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা কাজ শুরু করতে গেলে গতকাল বিকেলে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে এলজিইডির পরামর্শক ও কয়েকজন শ্রমিক কিছু সময় বিদ্যালয়ের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে তালা খুলে তাদের বের করে আনা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, ১৯৯০ সালে নির্মিত বিদ্যালয় ভবনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মাত্র চারটি শ্রেণিকক্ষে ছয়টি শ্রেণীর পাঠদান চলছে। নীলক্ষেত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল নাইমা বলেন, ‘এলজিইডির অধীনে ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরকারি অনুমোদন রয়েছে। তারপরও প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন অজুহাতে নির্মাণকাজ আটকে রাখা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এলজিইডির অনুমোদিত নকশা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কিন্তু কখনো জমির দাবি, কখনো অন্য অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান। নতুন ভবন নির্মিত হলে তারা নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। কিন্তু প্রকল্পটি বিলম্বিত হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে কাজ শুরু না হলে বরাদ্দের অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নীলক্ষেত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যসচিব মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম মোল্লা। তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে ভবনের নকশা চূড়ান্ত করার আগে আমাদের সাথে আলোচনা করা হয়নি। আমরা চাই, ভবনের নকশায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ করা হোক।’ আধিপত্য বিস্তার বা নির্মাণকাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা কাউকে ভয়ভীতি দেখাইনি। বরং এলজিইডির লোকজন বিদ্যালয়ের গেটের দু’টি তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছেন।’
এ বিষয়ে নীলক্ষেত হাইস্কুলের সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. মো: আলী জিন্নাহ বলেন, ‘আমার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত অবগত নই। জমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রোভিসি (প্রশাসন) দেখেন। আমি বিষয়টি তাকে জানিয়েছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করে দ্রুত একটি সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।’



