নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আরো হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন চাইলে ‘যেকোনো সময়’ ইরানে হামলা চালাতে পারে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু করা মার্কিন সামরিক অভিযান কত দিন চলতে পারে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প সংক্ষেপে বলেন, ‘আমার মনে হয় না, খুব বেশি দিন।’ খবর আলজাজিরা ও গার্ডিয়ানের।
বুধবার ট্রাম্প আরো বলেন, তিনি মনে করেন না যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে। একইসাথে তিনি আবারো বলেছেন, আসন্ন নির্বাচন ইরান বিষয়ে তার কৌশলের কোনো কারণ নয়। এদিকে সর্বশেষ মার্কিন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে এবং অন্তত আরো ১০৮ জন আহত হয়েছেন।
বুধবার ট্রাম্পের এই হুমকি আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুলাইয়ের পর সবচেয়ে বড় দফার হামলা-পাল্টা হামলার পর। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণ উপকূলের হরমুজ প্রণালীর কাছে কয়েকটি শহর ও এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে কুহেস্তাক শহরও রয়েছে, যেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা হয়েছে। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘাঁটির মধ্যে বাহরাইন, ইরাক ও জর্দানের ঘাঁটিও রয়েছে।
হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিল। একইসাথে তারা মাইন ফেলার কাজে ব্যবহৃত একটি রকেটও তৈরি করছিল। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সেটিও ধ্বংস করে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘গত রাতে আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি’ এবং ওই হামলায় ‘হরমুজ প্রণালী তীরবর্তী এলাকায় তারা যে নতুন সরঞ্জাম তৈরির চেষ্টা করেছিল, তার সবকিছু ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘তারা জর্দানে আমাদের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল বলেই আমরা গত রাতে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছি। আমরা গত রাতে তাদের কঠোরভাবে আঘাত করেছি। তারা সামান্য একটা পাল্টা আঘাত করেছিল, কিন্তু আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করেছি।’ তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীর তীরবর্তী এলাকায় ইরান যে নতুন সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী সেগুলো ‘ধ্বংস করে দিয়েছে’। এসব সরঞ্জামের কিছু ছিল প্রতিরক্ষামূলক এবং কিছু ছিল আক্রমণাত্মক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ‘গত রাতে আমরা তাদের শুধু রাডারই ধ্বংস করিনি, এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু ধ্বংস করেছি। গত রাতে এটি ছিল অত্যন্ত বড় ধরনের হামলা। আর আমরা যখন চাইব, তখনই আরেকটি হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত।’
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ-রেজা জাফারঘান্দি জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। তাদের একজন চার বছর বয়সী শিশু, যে সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চালানো হামলায় নিহত হয়েছে। ওই হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই কুহেস্তাকের হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একইসাথে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় না- যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবিরও জবাব দিয়েছেন তিনি। বাকাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘বাস্তবতা এতটাই ভয়াবহ যে আমেরিকার প্রচারণাও এর আগে কখনো এমন দাবি করার সাহস করেনি, যে দাবি আজ মার্কিন সামরিক বাহিনী করছে। সিরিক কোনো গল্প নয়। বেসামরিক মানুষ সত্যিকারের। নিহতরা সত্যিকারের।’ ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, কুহেস্তাকের ওই চার নিহতের জানাজা বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে। ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে।
আগস্টে রয়টার্স ও ইপসোসের পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিনি এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। বিপরীতে প্রায় ৬৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেন। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। চলতি সপ্তাহান্তে আবারো লড়াই শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রায় ৯৫ ডলারে উঠেছে, যা যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি। রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, সঙ্ঘাত শুরুর পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হারও ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আমি নির্বাচনে লড়ছি না। আমার দল লড়ছে এবং আমি আমার দলকে সহায়তা করতে যাচ্ছি। তবে আমি মনে করি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেয়ার বিষয়টিকে আমাদের দল গুরুত্ব দেয়।’ ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারে আবারো বেড়ে যাওয়া তেলের দাম সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘এগুলো কমে আসবে।’ ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়ার’ দাবি করার পর ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, এখন হামলা চালানোর মতো আর কী অবশিষ্ট আছে এবং কেন সেখানে হামলা চালানো হবে? ট্রাম্প সরাসরি ওই প্রশ্নের উত্তর দেননি। বরং তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘খুব শক্ত নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছি। আমরা প্রতিদিন প্রচুর জাহাজকে বের করে আনছি, যেগুলোতে রয়েছে লাখ লাখ ব্যারেল তেল।’ তিনি আরো বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কোনো সমস্যা ছাড়াই এটি করছি। মাঝেমধ্যে তারা একটি চালকবিহীন বিমানকে গুলি করে, আর আমরা সেটিকে ভূপাতিত করি। আমাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, অত্যন্ত শক্ত নিয়ন্ত্রণ।’
মঙ্গলবারও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী প্রতিদিন প্রায় ৩০টি জাহাজকে প্রণালী থেকে বের হতে সহায়তা করছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করত। পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফ্রন্টিয়ার কর্পসের সাবেক কমান্ডার তারিক খান বলেছেন, ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ক্রমবর্ধমানভাবে অস্বস্তিকর কৌশলগত অবস্থানে’ রয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর আগে যে সামুদ্রিক পরিস্থিতি ছিল, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়নি। বরং এখন এমন একটি সমস্যা মোকাবেলায় সামরিক সম্পদ ব্যয় করছে, যা এই যুদ্ধই তৈরি করতে সহায়তা করেছে।’
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী ছিল অবাধে চলাচলযোগ্য একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। ১৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় যুদ্ধ শুরুর পর এর জবাবে তেহরান এই নৌপথ বন্ধ করে দেয়।
প্রণালীটি খোলা রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি করলেও এখন প্রতিদিন মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ সেখানে চলাচল করছে। একইসাথে ইরান প্রণালীটি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, অনুমোদন ছাড়া হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় দু’টি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত পেয়ে অচল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান বাহরি জানিয়েছে, সপ্তাহের শুরুতে তাদের একটি জাহাজে হামলায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন। ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ চলতি সপ্তাহে আরো ১১টি জাহাজকে ‘নিয়ম না মানার’ অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এর আগে গত সপ্তাহে ৪৫টি জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজগুলো প্রণালী অতিক্রমের আগে ইরানের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দিলে তাদের জরিমানা, জাহাজ জব্দ অথবা বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরির অভিযান আরো জোরদার করেছে। তেহরানের সাথে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেয়া হচ্ছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ বজায় রেখেছে। পাকিস্তানের সাবেক এই জেনারেল বলেন, ইরান বুঝতে পারছে যে প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধটিকে ব্যয়বহুল করে তোলার চেষ্টা করছে তেহরান।
তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যদি সঙ্ঘাত আরো বাড়ান, তাহলে ইরান আমেরিকাকে আরো গভীরভাবে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে বলে তুলে ধরতে পারবে। আর তিনি যদি সংযত থাকেন, তাহলে তেহরান দাবি করতে পারবে যে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভের প্রয়োজন নেই। তাদের টিকে থাকতে হবে, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত রাখতে হবে এবং যুদ্ধটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে। তেহরানকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে আমেরিকার বিজয় সামরিক, অর্থনৈতিক এবং নির্বাচনী-তিন দিক থেকেই ক্রমেই অসাধ্য হয়ে ওঠে।’



