বিশেষ সংবাদদাতা
সময়ের সাথে বাংলাদেশের নীতিগত স্বায়ত্তশাসন হ্রাস পেয়েছে এবং সংস্কারগুলো জাতীয় অগ্রাধিকারের পরিবর্তে বাহ্যিক চাপ দ্বারা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) গতকাল রোববার তাদের সম্মেলন কক্ষে ‘উন্নয়ন কৌশল ও নীতিগত স্বাধীনতা : বাংলাদেশের উন্নয়ন পথচলা’ শীর্ষক একটি ঘরোয়া আলোচনায় এ কথা বলেন ওয়েস্টার্ন এমি সিডনি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর মরিটাস এবং প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ড.আনিসুজ্জামান চৌধুরী। গতকাল রোববার পিআরআই বনানী অফিসে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়।
আলোচনায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নীতিগত স্বাধীনতা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রবর্তিত বেসরকারিকরণ উদ্যোগ, তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের উত্থান এবং কৃষি একীকরণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
ড. চৌধুরী যুক্তি দেন যে, সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের নীতিগত স্বায়ত্তশাসন হ্রাস পেয়েছে এবং সংস্কারগুলো জাতীয় অগ্রাধিকারের পরিবর্তে বাহ্যিক চাপ দ্বারা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়াকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অর্থনৈতিক সাফল্য স্বাধীন ও ধারাবাহিক নীতি প্রণয়নের ফল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের কিছু নীতিগত নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলেনি, যা দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে নীতি নির্ধারণের গুরুত্বকে তুলে ধরে। কার্যকর শাসন ও নীতিগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য শক্তিশালী সামাজিক পুঁজি, একটি ক্ষমতায়িত নাগরিক সমাজ, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অপসারণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান- বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিমুক্তকরণ অপরিহার্য। ড. চৌধুরী এও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বিশ্বব্যাপী কঠোর অভিবাসন বিধিনিষেধের কারণে বিদেশে অভিবাসন আরো কঠিন হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশে সংস্কার এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সুযোগের চাহিদাকে ক্রমবর্ধমানভাবে চালিত করবে।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘বিগত ৫০ বছরে আমরা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখেছি।’ ১৯৯১ সালে পূর্ববর্তী বিএনপি সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তন করেছিল। ১৯৯০ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের পর যখন প্রবৃদ্ধি শূন্যে নেমে আসে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র কয়েক সপ্তাহের আমদানি ব্যয়ের সমান হয়ে যায় এবং বিনিময় হার আকাশচুম্বী হয় তখন নতুন গণতান্ত্রিক সরকার একটি রূপকল্প নিয়ে ক্ষমতায় আসে।’
ড. সাত্তার ব্যাখ্যা করেন যে, তৎকালীন সরকার অর্থনীতিকে আমদানি-নির্ভর ও রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত মডেল থেকে সরিয়ে একটি বাজারমুখী, উদারীকৃত ও মুক্ত-বাণিজ্য অর্থনীতির দিকে নিয়ে যায় এবং বিনিময় হারের নমনীয়তা, চলতি হিসাবের রূপান্তরযোগ্যতা, বেসরকারিকরণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার প্রবর্তন করে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, পরবর্তীকালে এই সংস্কারগুলোর অনেকগুলোই হয় পিছিয়ে গেছে অথবা সেগুলোতে প্রয়োজনীয় গভীরতার অভাব ছিল, যদিও বর্তমানে কিছু পরিমিত পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।
তিনি বৈদেশিক সাহায্যের ওপর বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল নির্ভরশীলতার দিকেও ইঙ্গিত করেন : ১৯৭০-এর দশকে, জিডিপির ৬% আসত সাহায্য থেকে এবং দেশটি ১০ মিলিয়ন টন খাদ্য ঘাটতি মেটাতে খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে, বৈদেশিক সাহায্য জিডিপির ২ শতাংশেরও কম, যেখানে ৯০ শতাংশেরও বেশি সরকারি বৈদেশিক ঋণকে ছাড়যুক্ত ঋণ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে- ২০২১-২২ সাল অনুযায়ী যার গড় সুদের হার ১.৩ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ২৩ বছর।
অধিবেশনে কামরান টি. রহমান, সভাপতি, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি; ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ; ড. সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম); ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, ডিন, স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; এবং মো: রেজওয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)ও বক্তব্যে রাখেন।
কামরান টি. রহমান বলেন, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের অর্থায়ন সবসময়ই শর্তসাপেক্ষ থাকে, যা সাধারণত সুশাসন ও সংস্কারের ওপর কেন্দ্র করে থাকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের শর্তগুলোর আসল সমস্যাটা কী, এবং জানতে চান যে এগুলো কি এমন কোনো বাধ্যবাধকতা যা বাংলাদেশের পূরণ করা প্রয়োজন ছিল, এখনো পূরণ করতে হবে, নাকি তা ইতোমধ্যে পরিত্যাগ করা হয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে তার নীতিগত বক্তব্য ও দর কষাকষির সক্ষমতা জোরদার করেছে, যার ফলে নীতিগত স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণ যখন অনিবার্য হয়ে উঠছে, তখন নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই স্বল্পমেয়াদি সমন্বয়ের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণ সম্পর্কেও সতর্ক করেন।
ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম সরকারি ঋণের গতি কমানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে কৃতিত্ব দিয়েছেন, কিন্তু সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, ক্রমবর্ধমান সুদের ব্যয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বেকারত্ব এবং ব্যয়বহুল অভ্যন্তরীণ ঋণের কারণে বাংলাদেশ গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
ড. সেলিম রায়হান উল্লেখ করেছেন, সুশীল সমাজ ধারাবাহিকভাবে একটি শক্তিশালী সংস্কার কর্মসূচির পক্ষে কথা বলেছে, অন্য দিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো উন্নয়ন অংশীদাররাও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে দেশের প্রেক্ষাপট বোঝা এবং সেই অনুযায়ী সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। তিনি আরো বলেন, এই সম্পৃক্ততার ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব দর কষাকষির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
মো: রেজওয়ান সেলিম শিক্ষার মান এবং মেধা পাচারের চলমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ড. ইমরান মতিন মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের সামাজিক ও গোষ্ঠীগত শক্তি এতটাই প্রবল যে, তাদের প্রভাব ছাড়া কোনো সরকারি নীতিই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল উন্নয়নকে সমর্থন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের বিষয়ে মতবিনিময় করেন। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন কৌশলকে এগিয়ে নিতে নীতিনির্ধারক, গবেষক, বেসরকারি খাতের নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের মধ্যে তথ্যভিত্তিক সংলাপের গুরুত্ব এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।



