তেলের দর ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজারে ধস লাভবান হবে রাশিয়া

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চার বছর পর আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। তেলের দামের এই উল্লম্ফনে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও বড় ধস নেমেছে। একই সাথে বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হওয়ায় রাশিয়া তেল বিক্রির নতুন সুযোগ পেয়ে লাভবান হতে পারে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ১৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। অন্য দিকে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ১৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১০৮ ডলার স্পর্শ করেছে। গত রোববার তেলের দাম সাময়িকভাবে ১১০ ডলারেও পৌঁছেছিল।

সরবরাহ সঙ্কট ও ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা : বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের কারণে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ বাজার থেকে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ যে পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়, সেই ‘হরমুজ প্রণালী’ এখন কার্যত অবরুদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়বে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব যদি ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার দাম মেনে নিতে পারে, তবেই তারা এই যুদ্ধ চালিয়ে যাক।

কেপলারের প্রধান বিশ্লেষক হুমায়ুন ফালাকশাহি জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে মার্চের শেষ নাগাদ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী যেকোনো ট্যাঙ্কারে হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে ইরানের তেল শোধনাগারে ইসরাইলের হামলার পর সঙ্ঘাত ‘নতুন পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে বলে দাবি করেছেন ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

ট্রাম্পের অবস্থান ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা : তেলের এই উচ্চমূল্যের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি চিরতরে শেষ করার বিনিময়ে তেলের এই সাময়িক উচ্চমূল্য বিশ্ব ও মার্কিন নিরাপত্তার জন্য খুবই সামান্য। তবে বিশ্লেষকরা তার এই আশাবাদের সাথে একমত নন। তারা মনে করছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে, যা সুদের হার আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে। তেলের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সোমবার সকালে গ্যাসের দাম প্রতি থার্মে ১৫৮ পয়সায় পৌঁছেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল ৮০ পয়সার নিচে।

শেয়ারবাজার ও বন্ড মার্কেটে ধস : জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডাউ ফিউচার ৮০০ পয়েন্ট বা ১.৭ শতাংশ কমেছে। এশিয়ায় জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক একপর্যায়ে ৮ শতাংশ কমে যাওয়ায় লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক ১.৪ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক প্রায় ৩.৯ শতাংশ নেমেছে। ইউরো জোনের বন্ড মার্কেটও চাপের মুখে রয়েছে। জার্মানিতে ১০-বছরের বুন্ড ইল্ড ২.৯২২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কুয়েত ও বাহরাইনের জ্বালানি সঙ্কটে নতুন মোড় : নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানি উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোয় ইরানের হামলা বৃদ্ধির পাশাপাশি কুয়েত বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকে ড্রোন হামলা হওয়ায় এই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। অন্য দিকে বাহরাইনের সরকারি জ্বালানি কোম্পানি ‘বাপকো’ তাদের তেল শোধনাগারে হামলার পর ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করেছে। এর ফলে কোম্পানিটি তার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীও সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় দেশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।

লাভবান হচ্ছে রাশিয়া : কূটনীতিকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং তেলের মূল্যসীমা নির্ধারণের কারণে রুশ অর্থনীতি যে চাপে ছিল, তেলের দাম বৃদ্ধিতে তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ভারত ও চীনকে রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করায় ক্রেমলিনের কোষাগার আবারো পূর্ণ হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় অনেক দেশ এখন বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার তেল কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

মূল্য নিয়ন্ত্রণে হোয়াইট হাউজের প্রচেষ্টা : হোয়াইট হাউজ থেকে হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজের জন্য নৌ-প্রহরী নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সামুদ্রিক বীমা কোম্পানিগুলোও এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে জাহাজ চলাচলে বীমা দিতে দ্বিধা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, উল্লেখযোগ্যভাবে উত্তেজনা হ্রাস না পেলে কেবল সামরিক প্রহরা দিয়ে বাজার শান্ত করা সম্ভব হবে না। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দাম মার্কিন নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান ও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।