উত্তরবঙ্গে ৩ হাজার কোটি টাকার ‘কৃষি হাব’ গঠনের প্রস্তাব
প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, খাদ্য নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করা, কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একগুচ্ছ নতুন কর্মসূচি ও আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার।
নতুন বাজেটে ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেয়ার পাশাপাশি ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ, উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনর্ভরণ (রিফাইন্যান্স) স্কিম, কৃষিপণ্যে উৎসে কর হ্রাস, সার ও কীটনাশকে কর অব্যাহতি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বীমা ও ভর্তুকিসহ নানা যুগান্তকারী উদ্যোগের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উত্থাপিত হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন। এর মধ্যে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ৯.৩৭ শতাংশ
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর : সম্মিলিত বরাদ্দ ছিল ৩৫,৩৭৪ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬৮%)। ২০২৪-২৫ অর্থবছর : বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৮,২৫৯ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬৩%)। ২০২৫-২৬ (চলতি) অর্থবছর : বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৯,৬২০ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬১%)।
চলতি অর্থবছরের (৩৯,৬২০ কোটি টাকা) তুলনায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে ৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের বাজেটের তুলনায় এবার বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৩৭ শতাংশ। ফলে এই তিন খাতের মোট প্রস্তাবিত বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৪৩,৩৩৫ কোটি টাকা, যা প্রাক্কলিত জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ।
কৃষক কার্ডে নগদ সহায়তা : এক ছাতার নিচে সব সরকারি সেবা
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, কৃষিকে জাতীয় সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে। চলতি বছরের পয়লা বৈশাখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় আগামী অর্থবছরে ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কার্ড দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষক, মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণচাষিকে এ কার্ডের আওতায় আনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা বছরে একবার দুই হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। এ জন্য বাজেটে এক হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু নগদ সহায়তার মাধ্যমই নয়; বরং এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষিবীমা, সরকারি উপকরণ বিতরণ এবং বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রম একটি সমন্বিত কৃষক ডাটাবেজের মাধ্যমে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
উত্তরবঙ্গে ৩ হাজার কোটি টাকার ‘কৃষি হাব’
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় এক হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সাথে উত্তরবঙ্গকে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকার একটি পুনর্ভরণ (রিফাইন্যান্স) স্কিম ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজের আওতাধীন এ তহবিলের ঋণে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এর ফলে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা অত্যন্ত কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন, যা বাণিজ্যিক কৃষির প্রসারে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কোল্ডচেইন ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত
বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে আরো বেগবান করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ অব্যাহত রাখা হবে। পাশাপাশি কৃষকদের বিনামূল্যে উন্নত মানের বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ দেয়া হবে।
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ, পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ডস্টোরেজ ও কোল্ডচেইন সম্প্রসারণ, বরেন্দ্র অঞ্চলে আমচাষিদের জন্য বিশেষ হিমাগার নির্মাণ এবং আধুনিক সংরক্ষণাগার ও প্যাকেজিং সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কৃষি উপকরণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় একটি সর্বাধুনিক কৃষক ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘স্বনির্ভর খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরায় চালু করে এর সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প ও ডাগওয়েল স্থাপন, ড্রিপ ইরিগেশন ও একুইফার রিচার্জ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের পাশাপাশি জলবায়ু সহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন এবং তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘এগ্রোপ্রেনারশিপ স্টার্টআপ নীতিমালা’ ও ‘কৃষি সমবায় নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কর ও শুল্ক ছাড়ে উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা
নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বাজারে স্বস্তি আনতে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন বীজের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ বা ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিকাজে ব্যবহৃত সব ধরনের সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং কীটনাশকের আমদানি পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামালের ভ্যাট শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ‘জিঙ্ক সালফেট’ উৎপাদনের জন্য ‘জিঙ্ক অ্যাশ’ আমদানির শুল্কও সম্পূর্ণ মওকুফের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
একই সাথে পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শূন্য শতাংশ শুল্ক এবং পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত নতুন তিনটি কাঁচামালেও বিশেষ শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তায় সংগ্রহ বৃদ্ধি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ২৪ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। একই সাথে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫৫ লাখ পরিবারকে বছরে ছয় মাস প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে মাত্র ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেয়া হবে। সারা দেশে এক হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ৪১৯টি উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় ৩০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করা হবে। স্থানীয় বীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ১০ বছরের জন্য বিশেষ কর অব্যাহতি এবং শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
সুনীল অর্থনীতি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদের বিকাশ
আগামী অর্থবছরে ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য খাত থেকে রফতানি আয় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে টুনা ও পেলাজিক মাছ আহরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ সম্প্রসারণ, কুয়াকাটা ও সলিমপুরকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা এবং মাতারবাড়িতে একটি আধুনিক মৎস্য বন্দর স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে সরকারের।
প্রাণিসম্পদ খাতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোট পক্সের ভ্যাকসিন মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উপজেলাভিত্তিক প্রাণীর জরুরি ওষুধ নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ ফিড উৎপাদন এবং গবাদিপশু পালনকারীদের জন্য ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বীমা ও বাজারজাতকরণ সুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই খাতের খামারিদেরও পর্যায়ক্রমে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।



