ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এরপর পাকিস্তান, তারপর নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়া। টানা চার সিরিজ জিতল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। প্রতিটি সিরিজ জয়ে বাহবা পেতে পারে বাংলাদেশ। তবে এর মাঝে আলাদা করে দেখা হবে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো। দীর্ঘ ২১ বছর পর মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে অসিদের বৃষ্টি আইনে হারাল ৮৬ রানে। গতকাল দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৩৬ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে হারিয়ে ২-০ তে সিরিজ জিতে নিলো মেহেদী হাসান মিরাজ বাহিনী। এখন ১৪ জুন বাংলাদেশের সামনে আরেকটি লক্ষ্য। সিরিজের শেষ ম্যাচে জয় পেলেই প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার অনন্য কীর্তিও গড়বে বাংলাদেশ। এখন শুধু ইংল্যান্ডকে হারাতে পারলেই চক্রপূরণ হয়ে যাবে। টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে বাকি শুধু থ্রি লায়ন্সরাই।
গতকাল দিনটিই ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধন, জাতীয় বাজেট উপস্থাপন। সেই ব্যস্ততার মাঝেও নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিল টাইগাররা। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে দাপুটে জয় তুলে নিয়ে ইতিহাস গড়ল মেহেদী হাসান মিরাজের দল। এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত করল লাল-সবুজের সেনারা। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করে এসেছে বাংলাদেশ। মাঝে এসেছে কিছু স্মরণীয় জয়, বড় বড় সাফল্যও। কিন্তু ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ কখনো পাওয়া হয়নি। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল মিরপুরে। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ হারানোর কীর্তি গড়ল টাইগাররা।
বাংলাদেশী পেসারদের দাপটে শূন্য রানেই তিন উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। তার পর ব্যাট হাতে গড়তে পারেনি বড় স্কোর। যদিও সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বৃষ্টির কারণে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস আর এগোয়নি। এ কারণে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪১ ওভারে ১৯২ রান। বেলা ২টা ৩৮ মিনিটে শুরু হয় বৃষ্টি। দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকার পর বেলা ৩টা ৩৪ মিনিট থেকে ওভার কাটার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধের আগে ৪২ ওভারে ১৮৮ রান করে অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচে তাসকিন ও মোস্তাফিজ ৩টি ও তানভীর নিয়েছেন ২ উইকেট। তার পর আর তারা বৃষ্টির কারণে মাঠেই নামতে পারেনি।
অস্ট্রেলিয়া যখন যেখানে ক্রিকেট খেলেছে, দাপটের সাথে খেলেছে। ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত ১০২৪টি ম্যাচ খেলেছে অস্ট্রেলিয়া। ইতিহাস বলছে, ১০২৪ ম্যাচে মধ্যে মাত্র দু’বার শূন্য রানে আউট হয়েছে দলটির দুই ওপেনারই। ২০২২ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘটেছিল এই ঘটনা। তার আগেরটা ১৬ বছর আগে ২০০৬ সালে। এবার বাংলাদেশের বিপক্ষে রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরেছেন তিনজন। সারা বছর অন্য দলকে লজ্জা উপহার দেয়া অস্ট্রেলিয়া সবশেষ সংযোজন হিসেবে এবার নিজেদের নামই দেখবে সেই তালিকায়।
প্রথম ওয়ানডেতে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে ম্যাচ হেরেছিল সফরকারীরা। দ্বিতীয় ম্যাচে টস জিতে তাই সেই ভুল করতে চায়নি অস্ট্রেলিয়া। তবে অধিনায়ক জশ ইংলিস বুঝতে পারেননি এই সিদ্ধান্ত তাদের আরো বেশি যন্ত্রণা দেবে।
গতকালও শুরুটা করেন তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের চতুর্থ বলেই ম্যাট শর্টকে ফেরান এই পেসার। দ্বিতীয় ওভারেই ম্যাচ নিজেদের দখলে নিয়ে নেন মোস্তাফিজুর রহমান। নিজের ওভারের প্রথম বলেই কুপার কনোলি ও শেষ বলে ম্যাথু রেনশকে ফেরান কাটার মাস্টার। ম্যাচের তৃতীয় ওভারেও দারুণ করেছিলেন তাসকিন। তবে নো বল দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে রান যোগ করেন তাসকিন। ‘ফ্রি হিট’ বল থেকে রান তোলার সব চেষ্টায় করেছিলেন ইংলিস। তবে তাসকিনের আউটসাইড অফ বল থেকে সুবিধা করতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক। সার্কেলের ভেতরে হাওয়ায় ভাসতে থাকা বল তালুবন্দী করলেও ফ্রি হিট বলের সুবাধে বেঁচে যান।
শূন্য থেকে বড় করা জুটিকে বড় হতে দেননি মোস্তাফিজুর। ম্যাচের অষ্টম ওভারে অ্যালেক্স ক্যারিকে ফিরিয়ে ভাঙেন ২৫ রানের জুটি। সতীর্থদের যাওয়ার আসা দেখতে দেখতে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন অজি অধিনায়ক। ইনিংসে চারটি বাউন্ডারি ও এক ওভার বাউন্ডারিতে ৩৪ রান করেন ইংলিস। বাংলাদেশের পেসারদের ভিড়ে লাইমলাইটে আসেন স্পিনার তানভীর ইসলাম। জশ ইংলিসকে ব্যক্তিগত ৩৪ রানে আউট করার পর সাজঘরে ফেরান আরেক ব্যাটার ক্যামেরন গ্রিনকে। আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার হারের ব্যবধান কমানো গ্রিন গতকাল ফেরেন ২৫ রানে।
দলীয় ৮১ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশের অপেক্ষা বাড়ান অভিজ্ঞ মারনাস লাবুশেন ও জেভিয়ার বার্টলেট। এই জুটিতে ম্যাচে লড়াই করার পুঁজি পায় অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে এই দুই ব্যাটার সবচেয়ে সাবলীল ব্যাটিং করেন। তবে দলীয় ১৮৪ রানে বার্টলেট আউট হলে ভাঙে ১০৩ রানের জুটি।
অস্ট্রেলিয়াকে কেন শক্তিশালী বলা হয় তা প্রমাণ করেছেন বার্টলেট। এই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের নামের পাশে বোলার লেখা হলেও করেছেন ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি। তাসকিনের বলে আউট হওয়ার আগে খেলেন ক্যারিয়ার সেরা ৫২ রানের ইনিংস। বার্টলেটকে ফেরানোর পর একই ওভারে অ্যাডাম জাম্পাকে নিজের তৃতীয় শিকারে পরিণত করেন তাসকিন।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই তানজিদ হাসান তামিম ফিরেন বোলারের হাতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে। তবে সেই ধাক্কা সামলে ইনিংস গড়ার দায়িত্ব নেন সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত। দুই ব্যাটারের ৮৬ রানের জুটি বাংলাদেশকে জয়ের পথে এগিয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে এগোতে থাকা সৌম্য ৪২ রান করে আউট হন। এরপর শান্তও একই স্কোরে ফিরে গেলেও তার ইনিংস ছিল বিশেষ এক মাইলফলকে পৌঁছার ইনিংস। এই ম্যাচে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দুই হাজার রান পূর্ণ করেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে এটি ছিল যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম সময়ে দুই হাজার রানে পৌঁছানোর কীর্তি।
মধ্যভাগে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। লিটন দাস ভালো শুরু করেও থামেন ২১ রানে। ক্যামেরন গ্রিনের বাউন্সারে গ্লাভসে লেগে উইকেটরক্ষক জশ ইংলিসের হাতে ক্যাচ দেন। মিরপুরে ওয়ানডেতে এখনো ফিফটির দেখা না পাওয়া লিটনের জন্য এটি ছিল আরেকটি হতাশার দিন। ছয়ে নেমে ইতিবাচক শুরু করেছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন। অ্যাডাম জাম্পাকে আক্রমণ করে কয়েকটি চমৎকার বাউন্ডারিও হাঁকান। কিন্তু বড় শট খেলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জাম্পার শিকার হন। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়ে।
তবে সেখান থেকে আর কোনো বিপদ হতে দেননি অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ও তৌহিদ হৃদয়। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ৩৫ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু একটি সিরিজই নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশ, বরং ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নতুন এক ইতিহাসও লিখেছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর : টস অস্ট্রেলিয়া (ব্যাটিং)
অস্ট্রেলিয়া : ৪২ ওভারে ১৮৭/৮ (ম্যাথিউ শর্ট ০, কুপার কনোলি ০, ম্যাট রেনশ ০, জশ ইংলিস ৩৪, অ্যালেক্স ক্যারে ১৩, ক্যামেরন গ্রিন ২৫, মারনাশ লাবুশানে ৫৫*, ব্রাটলেট ৫২, অ্যাডাম জাম্পা ০, নাথান ইলিয়াস ২*, তাসকিন ৩/৩৩, মোস্তাফিজ ৩/২৭, তানভীর ২/৪৫)।
বাংলাদেশ : ৩৫ ওভারে ১৯৫/৫ (টার্গেট ৪১ ওভারে ১৯২) (তানজিদ হাসান ০, সৌম্য ৪২, শান্ত ৪২, লিটন দাস ২১, তৌহিদ হৃদয় ৪০*, মোসাদ্দেক ১৫, মিরাজ ২২*, ব্রাটলেট ১/২৩, রিলে মেরেদিথ ১/৫০, জাম্পা ১/৪৩, রেনশ ১/২৯, গ্রিন ১/৯)।
ফল : ৩৬ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে জয়।
ম্যাচসেরা : মোস্তাফিজুর রহমান।
সিরিজ : তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-০ তে জয়ী।



