ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের (পিএমও) পরিচালক এস এম তরিকুল ইসলাম এখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রায় হাজার কোটি টাকার ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হয়েছেন। এ পদে থেকে তিনি আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও বিএনপি-জামায়াতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হেনস্তার মধ্যে রেখেছেন। কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করছেন আবার কাউকে হেনস্তা করছেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, ২০তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০১ সালের ২৮ মে মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় সহকারী কমিশনার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি টানা সুবিধা ভোগ করেছেন। ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিব মো: আব্দুস সোবহানের পিএস হিসেবে যোগ দেন। ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর পদোন্নতি পেয়ে উপসচিব হন। এরপর পিএমও অফিসের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৯ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনার আস্থাভাজন এস এম তরিকুল ইসলামকে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে পদায়ন করা হয়। ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকার তাকে যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়। ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের সচিব পদে নিয়োগ দেয় সরকার। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
সর্বশেষ গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তাকে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পের পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব দেয়া হয়। এ প্রকল্পে সারা দেশে ৭২ হাজার ৩৭২টি কেন্দ্র এবং ৮৬টি রিসোর্স সেন্টার রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বেতনভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৭২ হাজার ২২২ জন। শিক্ষাথী রয়েছে ২৪ লাখের বেশি। এ প্রকল্পে বছরে আট শ’ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে দুর্বল মনিটরিং : নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে এ প্রকল্প পরিচালনা করা হলেও মাঠপর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মনিটরিং খুবই দুর্বল। সম্প্রতি খুলনার বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোবরচাকা মেইন রোড ও নবীনগরে পাশাপাশি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষাকার্যক্রমের তিনটি কেন্দ্র রয়েছে। দৃশ্যমান সাইনবোর্ড ও ৩০-৩৫ জন করে শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও সেখানে তা নেই। কেন্দ্র মনিটরিংয়ের কথা থাকলে আশপাশের বস্তি থেকে ছেলেমেয়েদের খবর দিয়ে আনা হয়। এ ঘটনা জানাজানি হলে তড়িঘড়ি করে গত ২৭ জুলাই দুই সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করেন প্রকল্প পরিচালক এস এম তরিকুল ইসলাম। সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বললেও তদন্তে কেউ এ পর্যন্ত খুলনায় যাননি। এ ছাড়া বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদার ও মাঠ কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও গত ১৬ আগস্ট তাকে বদলির মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। জানা যায়, ২০২৫-এর জুলাই থেকে ২০২৬-এর জুন পর্যন্ত জেলার ১৬ জোনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন থেকে বিভাগীয় অফিসে এসি ও আইপিএস কেনার কথা বলে তিন লাখ ৭৮ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। ৮ জুলাই দাকোপের পরিচ্ছন্নতাকর্মী পারভীনা বেগম অফিস সহকারী ইভানা আক্তার শিলার কাছে ৩০ হাজার টাকা জমা দিলে খবর পেয়ে খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবু সায়েদ মো: মনজুর আলম হাতেনাতে তা জব্দ করেন। পারভীনা বেগম জানিয়েছেন, চাকরি টিকিয়ে রাখতে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়। তেরখাদা ফিল্ড সুপারভাইজার মোকাররব বিল্লাহ জানান, ১৬-৩০ জুন খুলনার ৯ ভেন্যুতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের বরাদ্দের টাকা থেকে খরচের বিল-ভাউচারে বিভাগীয় পরিচালকের স্বাক্ষর দিতে আপত্তির কথা জানিয়ে ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করা হয়।
এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত এস এম তরিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, খুলনার ঘটনায় তদন্তের জন্য খুব শিগগিরই টিম পাঠানো হবে। স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা অনিয়মে জড়িয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য তাদের বদলি এবং কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিবের পিএস, পরিচালক ও গাজীপুরে ডিসি হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন।



