দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে উত্তপ্ত ভূরাজনীতি

Printed Edition

রয়টার্স, এপি ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

বিশাল জলরাশির কোথাও কনটেইনারবাহী জাহাজ, কোথাও তেলবাহী ট্যাংকার; আবার কোথাও যুদ্ধজাহাজের সতর্ক টহল। বাইরে থেকে এটি শুধু একটি সমুদ্র- কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মঞ্চ। এই সমুদ্রের নাম দক্ষিণ চীন সাগর। এখানে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য।

কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রাঞ্চল নিয়ে দেশটি নতুন করে ধাক্কা খেল। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ ১৪টি দেশ সম্প্রতি এক বিৃবতিতে জানিয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সম্প্রসারণমূলক ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ দাবি বা প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকার ওপর অধিকার দাবির বিষয়টি অবৈধ। এতে ক্ষেপেছে চীন। ফলে সমুদ্রটি ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। দেশগুলোর দাবিকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ)। আর এসব দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং।

গত ১২ জুলাই দেয়া বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ছাড়াও ফিলিপাইন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, জার্মানি, ইতালি, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া এবং সেøাভেনিয়ার নাম আছে। জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনের (আনক্লস) অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালে ২০১৩ সালে চীনের বিরুদ্ধে একটি সালিশি মামলা দায়ের করে ফিলিপাইন। ২০১৬ সালের ১২ জুলাই নেদারথল্যান্ডসের হেগে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল ‘দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দাবির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই’ রায় দেয়।

বছরের পর বছর ধরে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য নিয়ে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও তাইওয়ান অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আসছে। ফলে প্রায়ই সমুদ্রটি ঘিরে আঞ্চলিক অচলাবস্থা দেখা দেয়।

বিবৃতিতে ১৪টি দেশ দক্ষিণ চীন সাগরের চীনের দখলদারত্বমূলক কার্যকলাপ প্রত্যাখ্যান করেছে। ২৭ সদস্যের ইইউ একটি পৃথক বিবৃতিতে ১২ জুলাইয়ের রায়টিকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিবৃতিদাতা দেশগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তাতে বলা হয়েছে, সালিশি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চীনের নিয়মিত ভূখণ্ডের বাইরে দক্ষিণ চীন সাগরের সম্পদের ওপর দেশটির ঐতিহাসিক অধিকার দাবি অবৈধ। আনক্লস মূলত বিশ্বের মহাসাগর ও সমুদ্র শাসনকারী চুক্তি হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত। এটি ১৯৯৪ সালে কার্যকর হয়। চীন, ফিলিপাইনসহ ১৭০টিরও বেশি দেশ ও পক্ষ এটি অনুমোদন করেছে। বিবৃতিদাতা দেশগুলোর বক্তব্য, ‘আমরা দক্ষিণ চীন সাগরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাই। চীনের অস্থিরতা সৃষ্টিকারী বা বলপ্রয়োগের পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছি।’

দেশগুলো জোর দিয়ে বলেছে, ‘সাগরটিতে চীন অন্যান্য রাষ্ট্রের বৈধ কার্যক্রমে বাধা দেয়, হয়রানি করার পাশাপাশি ভয়ও দেখায়। দেশটি এজন্য কোস্টগার্ড, সামরিক ও সামুদ্রিক মিলিশিয়া বাহিনী ব্যবহার করে। আমরা এগুলোর তীব্র বিরোধিতা করি। এতে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে।’

ওই বিবৃতির তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছে চীন। দেশটি জানিয়ে দিয়েছে, ২০১৬ সালের সালিসি রায়টি বাতিল ও অকার্যকর এবং এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বেইজিং রায়টিকে স্বীকৃতি দেয় না। চীন ২০১৩ সালে ফিলিপাইনের শুরু করা ওই সালিসে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। রয়টার্স লিখেছে, বেইজিং কার্যত সমগ্র ওই সমুদ্রপথের ওপর আগের দাবিতেই অটল রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সালিশি ট্রাইব্যুনাল এবং এর রায় আন্তর্জাতিক সালিশির সাধারণ রীতির গুরুতর লঙ্ঘন। এই রায় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ও আনক্লসের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে চীনের বৈধ অধিকারকে গুরুতরভাবে ক্ষুণœ করে এবং এটি অন্যায় ও বেআইনি।

বেইজিং বলেছে, চীন ওই রায়গুলোর ওপর ভিত্তি করে নেয়া যেকোনো দাবি বা পদক্ষেপের বিরোধিতা করে এবং তা কখনোই মানবে না। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেয়া কোনো সমাধান বেইজিং গ্রহণ করে না।

চীন-জাপানের মধ্যে উত্তেজনা: ১৪ দেশের বিবৃতিতে চীনকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রধান হুমকি ও উস্কানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চীন তার অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তিসঙ্গত, আইনসম্মত, পেশাদার এবং সংযত উপায়ে সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে। একজন জাপানি মন্ত্রী ওই রায়ের বিষয়ে চীনের অবস্থানের সমালোচনা করেছে। এরপরই বেইজিং একটি পৃথক বিবৃতিতে টোকিওর সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছে।

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছেন, ২০১৬ সালের সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে চীনের অস্বীকৃতি দক্ষিণ চীন সাগরে শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি নীতির পরিপন্থী। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে বেইজিং জাপানি দূতাবাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে তলবও করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করেছেন ম্যানিলায় নিযুক্ত বেইজিংয়ের শীর্ষ কূটনীতিক জিং কুয়ান। পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, এই সালিশি প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্রে জিং লিখেছেন, ম্যানিলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিভ্রম ত্যাগ করা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। অস্থির দক্ষিণ চীন সাগর: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্কিত জলসীমায় আঞ্চলিক সঙ্ঘাত আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চীনা, ফিলিপিনো এবং ভিয়েতনামী বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা রয়েছে।

চীনের উপকূলরক্ষী জাহাজ ও সহায়ক নৌযানগুলো ফিলিপাইনসহ অধিকার দাবিদার দেশগুলোর জেলেদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জলকামান ব্যবহার করে আসছে। পাশাপাশি সামরিক লেজার ও বিপজ্জনক প্রতিরক্ষা কৌশল ব্যবহার করে তারা। ফলে গভীর সমুদ্রে সংঘর্ষ এবং সমুদ্রের আকাশে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বারবার চীনকে সালিশি রায় মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্টট জো বাইডেন ও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন উভয়ই সতর্ক করেছে, বিতর্কিত জলসীমায় ফিলিপাইনের নৌবাহিনী বা জেলে হামলার শিকার হলে ফিলিপাইনকে রক্ষা করতে ওয়াশিংটন বাধ্য থাকবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষিণ চীন সাগরকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ সামুদ্রিক করিডোর হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। এই জলরাশিতে নৌচলাচল ও আকাশপথে উড্ডয়নের স্বাধীনতায় অন্য কারো হস্তক্ষেপ সহ্য করে না বেইজিং। চীন মনে করে, ২০১৬ সালে দেয়া আনক্লসের রায়টি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনের পরিবর্তে কেবল তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।