মিয়ানমারে পাঁচ বছরের সঙ্ঘাতে নিহত ১ লাখ ছাড়াল

Printed Edition
পশ্চিম রাখাইনের একটি হাসপাতালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলায় পর নিহতদের স্বজনদের শোকের মাতম। ছবিটি ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বরের  :  ইন্টারনেট
পশ্চিম রাখাইনের একটি হাসপাতালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলায় পর নিহতদের স্বজনদের শোকের মাতম। ছবিটি ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বরের : ইন্টারনেট

আরব নিউজ

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতে নিহতের সংখ্যা এক লাখের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট’ (এসিএলইডি) এই উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এটি এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

সংস্থাটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত এক লাখ ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে নিহতের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা এই তালিকার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে গণতন্ত্রপন্থী নেতা অং সান সু চিকে আটক করে দেশটির সেনাবাহিনী। এর পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়ে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই সংঘাতই এখন পূর্ণাঙ্গ এক গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

চরম মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ

এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন নিরীহ বেসামরিক নাগরিকেরা। সামরিক বাহিনীর নির্বিচার বিমান হামলা, ভারী গোলাবর্ষণ ও সম্মুখ সমরে অসংখ্য পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছেন। রাখাইন রাজ্যের ৪৯ বছর বয়সী বাসিন্দা থেইন আয়ে নু সম্প্রতি এক বিমান হামলায় তার স্বামীকে হারিয়েছেন। চলমান এই নরকযন্ত্রণা নিয়ে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি জানান, এই দুর্ভোগের যেন কোনো শেষ নেই। এখন কার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, সেটিও আর বুঝে উঠতে পারছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে সীমিত পরিসরে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বিস্তীর্ণ এলাকায় কোনো ভোটগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া অং সান সু চির দলও কার্যত এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ফলে গণতন্ত্রপন্থী মহল এই নির্বাচনকে জান্তা সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি অপকৌশল হিসেবেই দেখছে। অন্যদিকে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোও জান্তার দেয়া শান্তি আলোচনার সব প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

বাস্তুচ্যুত ৩৭ লাখ, ধেয়ে আসছে দুর্ভিক্ষ

জাতিসঙ্ঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের জেরে মিয়ানমারে এ পর্যন্ত ৩৭ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। একই সাথে দেশটিতে দারিদ্র্য ও খাদ্যসঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশটির প্রতি পাঁচজন নাগরিকের মধ্যে একজন তীব্র খাদ্যসঙ্কটে ভুগছেন।

সংঘাত পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে দেশজুড়ে জান্তা-বিরোধী প্রায় এক হাজার ২০০টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু বড় ধরনের সামরিক অগ্রগতি অর্জন করলেও, পরবর্তীতে সামরিক বাহিনী তাদের হারিয়ে যাওয়া কৌশলগত সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এ দিকে তীব্র সৈন্যসঙ্কট মোকাবেলা করতে ২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইন চালু করে জান্তা সরকার। এই আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার নাগরিককে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। জান্তা বাহিনী থেকে পালিয়ে আসা এক সাবেক সেনা সদস্যের ভাষ্যমতে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এই সাধারণ নাগরিকদের কোনো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

সীমান্ত পেরিয়ে বাড়ছে আঞ্চলিক সঙ্কট

পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলেছেন, মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের বিষাক্ত প্রভাব এখন সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যার ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোর ওপর মানবিক চাপ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। এর পাশাপাশি সংঘাতকবলিত এলাকাগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদক উৎপাদন, আন্তর্জাতিক পাচার এবং অনলাইন প্রতারণা (স্ক্যাম) চক্রের বিস্তার যা এই সামগ্রিক সংঘাতকে আরো বেশি জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে।