বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম
সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র প্রথমে ভুক্তভোগীদের জি-মেইল ও অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অর্থ স্থানান্তর করে। এভাবে হাতিয়ে নেয়া লাখ লাখ টাকা একাধিক স্তরে স্থানান্তরের মাধ্যমে আড়াল করে পরবর্তীতে অনলাইন জুয়া এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষদের কাছ থেকে মাত্র ১/২ হাজার টাকার বিনিময়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও সিম সংগ্রহ করে প্রতারকরা অবৈধ লেনদেনে ব্যবহার করে আসছিল। সংঘবদ্ধ এই প্রতারণা থেকে রেহাই পেতে সচেতনতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো: মাসুদ আলম গতকাল শুক্রবার বিকেলে এক প্রেসব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান। এ সময় জানানো হয়, গত ৭ এপ্রিল বিকেলে দোকানে থাকা অবস্থায় সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা এলাকার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু হয় এবং একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে মোবাইল ফোন চালু হলে তিনি দেখতে পান তার ব্যবহৃত বিকাশ, নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকিং অ্যাপস মোবাইল থেকে উধাও হয়ে গেছে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ইউসিবি ব্যাংকের কয়েকটি হিসাব থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং বিকাশ/নগদ নম্বরে স্থানান্তর হয়ে যায়। বিষয়টি টের পেয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন এবং বুঝতে পারেন যে তিনি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্রের শিকার হয়েছেন।
এ ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় মামলা রুজু হলে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত শুরু করে। ডিজিটাল বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো: ইকবালসহ অন্য সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটিত হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে চক্রটির প্রধান মো: ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন, ১৮টি বিকাশ রেজিস্ট্রেশনকৃত সিম, আটটি ব্যাংক চেক বই, তিনটি ব্যাংক কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের জি-মেইল ও অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করত। এরপর ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অর্থ স্থানান্তর করত। আত্মসাৎকৃত অর্থ একাধিক স্তরে স্থানান্তরের মাধ্যমে আড়াল করে পরবর্তীতে অনলাইন জুয়া, গরু ব্যবসা এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হতো।
চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। চক্রের প্রধান ইকবালের বিরুদ্ধে ফেনী ও নোয়াখালী জেলায় একই ধরনের অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে। সহযোগী রুবেলের বিরুদ্ধেও প্রতারণাসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায়, প্রতারকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে ১০০০-২০০০ টাকার বিনিময়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও সিম সংগ্রহ করে অবৈধ লেনদেনে ব্যবহার করত। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ ক্যাশ-আউট করে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করত।
সাইবার প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশনাগুলো দেয়া হয়।
জি-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যাংকিং ও এমএফএস অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা; মেইল ফরোয়ার্ডিং চালু আছে কি না নিয়মিত পরীক্ষা করা; টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখা; ওটিপি, পিন, সিভিভি পাসওয়ার্ড বা ভেরিফিকেশন কোড কারো সাথে শেয়ার না করা; অচেনা লিংক, ই-মেইল, এসএমএস ও রিমোট অ্যাক্সেস অ্যাপস (এনি ডেস্ক, টিম ভিউয়ার, রাস্ট ডেস্ক ইত্যাদি) ব্যবহার থেকে বিরত থাকা; মোবাইলে পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য সংরক্ষণ না করা; অপরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে নিজের নামে সিম, বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক হিসাব খুলে না দেয়া; মোবাইল হারিয়ে গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও এমএফএস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং সন্দেহজনক লগইন বা লেনদেন দেখতে পেলে তাৎক্ষণিকভাবে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা এবং কর্তৃপক্ষকে জানানো।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকদের নিরাপত্তা জোরদারে ফেইস ভেরিফিকেশন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথেনটিকেশন, ডিভাইস ভেরিফিকেশনসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।



