বোয়ালমারীতে ‘শ্রমিক হাটে’ বিভিন্ন জেলার মানুষ

Printed Edition

ইকবাল হোসেন লিমন বোয়ালমারী (ফরিদপুর)

কাকডাকা ভোরে হাতে কোদাল, কাস্তে কিংবা ঝুড়ি নিয়ে একে একে জড়ো হন শত শত মানুষ। কারো চোখে কাজ পাওয়ার প্রত্যাশা, কারো ভাবনায় দিনের মজুরি দিয়ে সংসারের চাকা সচল রাখার হিসাব। ফরিদপুরের বোয়ালমারী রেলওয়ে স্টেশন ও হেলিপ্যাড এলাকায় প্রতিদিন বসা শ্রমজীবী মানুষের এই সমাবেশ স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘শ্রমিক হাট’ নামে। প্রায় এক দশক ধরে চলে আসা এ হাটে কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছুটে আসেন মৌসুমি কৃষিশ্রমিকরা।

কৃষিনির্ভর বোয়ালমারীতে দীর্ঘদিন ধরেই শ্রমিকের ভালো চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে পাট ও ধানের মৌসুমে জমি প্রস্তুত, আগাছা পরিষ্কার, চারা রোপণ, ফসল কাটা, আঁটি বাঁধা ও পাট জাগ দেয়ার মতো কাজে বাড়তি শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। স্থানীয় শ্রমিক সঙ্কটের কারণে সেই চাহিদা পূরণে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌসুমি শ্রমিকরা বোয়ালমারীর এই শ্রমিক হাটে আসেন। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোরে শ্রমিক হাটে কাজের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন শ্রমিকরা। কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী দরদাম ঠিক হলে গৃহস্থের সাথে তারা চলে যান বিভিন্ন গ্রামের মাঠে। কাজের ধরন ও পরিমাণভেদে বর্তমানে একজন শ্রমিক দিনে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থের বাড়িতে দুই বেলা খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে। কয়েক মাসের কৃষি মৌসুমে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরে কাজ করে সংসার চালান এসব শ্রমজীবী মানুষ।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় বোয়ালমারীর গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। সময়ের সাথে শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি ও বিদেশগমনসহ নানা কারণে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ কৃষিশ্রম থেকে সরে গেছেন। এতে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও মাঠে কাজ করার মতো স্থানীয় শ্রমিকের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণ করছেন বাইরের জেলার মৌসুমি শ্রমিকরা।

রাজশাহী থেকে আসা দিনমজুর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাজের সন্ধানে বোয়ালমারীতে এসেছি। কাজের ধরন অনুযায়ী প্রতিদিন ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়। কৃষি মৌসুমে এখানে কাজের চাহিদা থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে শ্রমিকরা আসেন।’ একই জেলার শ্রমিক শাহিন হোসেন বলেন, রাজশাহীতে ধান লাগানোর কাজ শেষ হওয়ায় তারা বোয়ালমারীতে এসেছেন। কখনো ভোরে, আবার কখনো সন্ধ্যায় শ্রমিক হিসেবে কাজ পান তারা। কেউ কেউ স্টেশনের আশপাশে বাসা ভাড়া করে থাকেন। এতে প্রতিদিন তাদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। নওগাঁ থেকে আসা শ্রমিক রবিউল শেখ বলেন, ‘আগের তুলনায় কাজের পরিমাণ কমেছে, কিন্তু দিনমজুরের সংখ্যা বেড়েছে। গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করলে দুই বেলা খাবার দেওয়া হয় এবং কাজ শেষে মজুরি পরিশোধ করা হয়। স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান শ্রমিক নিতে হাটে এসেছেন। তিনি বলেন, ধান রোপণের জন্য শ্রমিক নিতে এখানে এসেছি। এলাকার অনেক মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিক দিয়েই কৃষি কাজ করাতে হচ্ছে।