নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সমাহিত করার পরই প্রতিশোধ নেয়ার বার্তা দিলেন ছেলে মুজতাবা খামেনি। বাবার ‘পবিত্র রক্তের বদলা’ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘প্রতিশোধ আমাদের জাতির আকাক্সক্ষা’। মুজতাবার বার্তা ছাড়াও আলি খামেনির নামাজে জানাজায় সমবেত ইরানিরা ট্রাম্পকে হত্যার দাবিতে প্রকাশ্য স্লোগান দিয়েছিলেন ইরানিরা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তেহরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গতকাল শনিবার আলজাজিরা লিখেছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বার্তা দিয়েছেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা। এক দিন আগেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে হজরত ইমাম রেজা মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছে। লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে তার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা চলেছে সপ্তাহ ধরে। দাফনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের নেতা ও প্রতিনিধিদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন মুজতাবা খামেনি। আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল গত মার্চে। কিন্তু সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ চলতে থাকায় তা স্থগিত করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রথম দিনেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর তার ছেলে মুজতাবা খামেনিকে দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। একই হামলায় মুজতাবাও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এর পর থেকে তাকে এ পর্যন্ত জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি বাবা ও স্ত্রীর নামাজে জানাজায় তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।
ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নামাজে জানাজায় সমবেত ইরানিরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার দাবিতে প্রকাশ্য স্লোগান দেয়ার পর তেহরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর আগে ইসরাইলও ট্রাম্পকে সতর্ক করে জানিয়েছিল, তেহরান প্রশাসন তাকে হত্যার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় রয়েছে। গতকাল শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া এক আক্রমণাত্মক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের দিকে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তাক করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে, অর্থাৎ আমাকে হত্যার জন্য ইরান সরকার বিশ্বজুড়ে যে হুমকি দিচ্ছে, যদি তার বাস্তবায়ন হয় বা তারা চেষ্টা করে, তবে মুহূর্তের মধ্যে ইরানে আরো হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানবে।’
পোস্টে ট্রাম্প আরো লেখেন, ‘এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি করা হয়েছে। আগামী এক বছর মেয়াদের মধ্যে (যা পরে বাড়ানো হতে পারে) ইরানের প্রতিটি অঞ্চল সম্পূর্ণ ধ্বংস ও গুঁড়িয়ে দিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন পুরোপুরি প্রস্তুত ও সক্ষম।’
মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার একটি নতুন এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছে বলে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিল ইসরাইল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যে ইরানের একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সক্রিয় ষড়যন্ত্রের বিবরণ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও এই হুমকিকে ‘একেবারে নতুন’ বলে নিশ্চিত করেছে। ২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই তেহরান ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার শপথ করে আসছে। এই হুমকির কারণেই চলতি সপ্তাহের শুরুতে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন থেকে ফেরার সময় মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ট্রাম্পকে বিমান পরিবর্তন করার অনুরোধ করেছিল।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন উগ্র বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও তেহরানের সাথে শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত করার আলোচনা এখনো চলছে বলে জানা গেছে। দুই রাত ধরে ইরানে মার্কিন বিমান হামলা চলে। এর জবাবে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের সাথে সাময়িক যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটেছে। ট্রাম্প তার পোস্টে লেখেন, “ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান আমাদের ‘আলোচনা’ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। আমরা তাতে রাজি হয়েছি, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতির দিন শেষ!” ওয়াশিংটনের এই ক্রমবর্ধমান চাপের জবাবে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, তেহরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা স্মারক থেকে ওয়াশিংটন পিছিয়ে গেলে ইরান আত্মরক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জোর দেন তিনি। গালিবাফ বলেন, ‘দেশ রক্ষার প্রস্তুতি আমরা কখনোই বন্ধ করিনি। আমেরিকানরা যদি কোনো মুহূর্তে এই সমঝোতা ভঙ্গ করে, তবে আমরা পূর্ণ মাত্রায় আত্মরক্ষামূলক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। যুদ্ধ বন্ধ করা বিশ্বের দেশগুলোর অগ্রাধিকার হতে পারে, তবে সবার জানা উচিত যে, এই সঙ্ঘাত কখনোই ইরানের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শেষ হবে না।’
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও চলমান যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনায় বসতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করার খবর নাকচ করেছে ইরান। তবে যুদ্ধবিরতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য শুক্রবার কাতারের একজন মধ্যস্থতাকারী মাশহাদ সফর করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র। শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ কথা বলেছেন বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে মেহের নিউজ এজেন্সি।
ওই সাক্ষাৎকারে ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘নতুন সামরিক হামলা, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের তেল রফতানির লাইসেন্স বাতিলের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘন করছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান কেবল পারস্পরিক পদক্ষেপের ভিত্তিতেই নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে।’ বাঘাই জানান, কাতারের মধ্যস্থতাকারী তেহরানের অনুরোধে নয়, নিজ উদ্যোগে ইরান সফরের আবেদন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার অনুরোধ করিনি। তবে আঞ্চলিক একজন মধ্যস্থতাকারীর ইরান সফরের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করিনি।
তিনি বলেন, মাশহাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কাতারের প্রতিনিধিদের কাছে ইরান তার অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বাঘাইয়ের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অঙ্গীকার ভঙ্গ’ একটি পুরনো অভ্যাস। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও তারা আগের ইরানি সরকারকে দায়ী করেছিল। আর এখন বর্তমান সরকারের সাথেও করা সমঝোতা লঙ্ঘন করছে। তার ভাষ্যানুযায়ী, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র ২২ দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার তা লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে নতুন হামলা, মার্কিন ট্রেজারির মাধ্যমে তেল রফতানির লাইসেন্স বাতিল ও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
বাঘাই বলেন, আমাদের নীতি হলো- প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি। অপরপক্ষ সমপর্যায়ের পদক্ষেপ না নিলে আমরা কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব না। যদি তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তাহলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং ভবিষ্যতেও এই নীতি অনুসরণ করবে।
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের অনুরোধে আহ্বান করা হয়েছিল। বাঘাইয়ের দাবি, এ বৈঠকের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা ২২৩১ নম্বর প্রস্তাব ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর আইনি কার্যকারিতা হারিয়েছে। তিনি জানান, চীন ও রাশিয়া ওই বৈঠকের বিরোধিতা করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রবেশাধিকার দেয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ হামলার সময় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছিল।’
উভয়পক্ষের চরম হুঁশিয়ারি এবং ইরানের পাঁচটি প্রদেশে মার্কিন বিমান হামলার পরও পর্দার আড়ালে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এরই মধ্যে তেহরান সফর করেছেন। ইরানের তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনার জন্য দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ওমানের রাজধানী মাস্কাটে অবস্থান করছেন।
এ দিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। থমকে যাওয়া আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা ও ট্রাম্পের হুমকির পর ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে চরম সন্দিহান তেহরান। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট, চুক্তি করতে হলে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত ও পারমাণবিক সামগ্রী হস্তান্তর করতে হবে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে এরই মধ্যে তেহরানকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।



