৬০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে দখলদারিত্ব কায়েম করেছিল আ’লীগ

ভেঙে দেয়া হতো ট্রাস্টি বোর্ড, লুটপাট কোটি কোটি টাকা

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে সঙ্কটের ছায়া

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, ট্রাস্টি বোর্ড দখল, সুশাসনের ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কাঠামোয় প্রভাব বিস্তার করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ১২ বছরে দেশের ৬০টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে যার অধিকাংশেরই নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক স্বার্থ।

কোথাও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে, কোথাও আবার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দখল হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত উদ্যোক্তা ও পরিচালনা কাঠামোর হাতে ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল উচ্চশিক্ষায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসঙ্কট দূর করার লক্ষ্য নিয়ে। তবে তিন দশক পর এই খাতের বড় বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ট্রাস্টি বোর্ডে প্রভাব বিস্তার, আর্থিক অনিয়ম, স্থায়ী ক্যাম্পাসের ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অনুমোদন পায়। ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ওই সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। নতুন অনুমোদন পাওয়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাবেক বা সক্রিয় রাজনীতিক এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত না থাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্য, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ট্রাস্টি বোর্ডে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

২০২৪ সালের শুরুতে ইউজিসির পর্যবেক্ষণে আরো উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। ওই সময়ে কমিশন ৩০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার পরামর্শ দেয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়- অনুমোদিত ভিসির অনুপস্থিতি, অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস পরিচালনা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে ব্যর্থতা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন লঙ্ঘন। ইউজিসি সতর্ক করে জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়লে তার দায় কমিশন নেবে না।

ইউজিসির আরেক নোটিশে দেখা যায়, বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতি-নিযুক্ত বৈধ ভিসি, প্রোভিসি কিংবা কোষাধ্যক্ষ নেই। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কমিশনের মতে, আইনের মৌলিক শর্ত পূরণ না করেই অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ইউজিসি বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্ত করলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুপারিশ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়নি। ফলে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ব্যর্থতা, আর্থিক অনিয়ম, পূর্ণকালীন শিক্ষকের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা বছরের পর বছর চলতে থাকে।

সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠজন এবং দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দেশের অন্তত সাতটি বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জোরপূর্বক দখল, ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ ইউজিসির কাছে জমা পড়েছে। সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ওই রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ভেঙে পড়ে এবং বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে শুরু করে। এই তালিকায় থাকা প্রধান কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি : রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দখল করা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকার শীর্ষে ছিল এটি। ঢাকার আশুলিয়ায় অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ট্রাস্টি বোর্ড জোরপূর্বক ভেঙে তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে সম্পূর্ণ আওয়ামী ঘরানার নেতাকর্মীদের দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়।

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) : ২০২১ সালের মার্চ মাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চেয়ারম্যানসহ ট্রাস্টি বোর্ডের ১২ সদস্যকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান পদ দখল করেন। সরকার পতনের পর এটি আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরেছে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ) : দেশের অন্যতম শীর্ষ এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতেও আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক চাপ ও আচার্যের (রাষ্ট্রপতি) ক্ষমতার অপব্যবহার করে ট্রাস্টি বোর্ডে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। পুরনো সাতজন ট্রাস্টিকে বাদ দিয়ে তৎকালীন সরকারের অনুগতদের বসিয়ে পুরো প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় (চট্টগ্রাম): চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে নির্মিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির দখল প্রক্রিয়া ছিল আরো বেপরোয়া। তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আদালতের নির্দেশনা তোয়াক্কা না করে নিজেই ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ দখল করেন। এই দখলদারিত্ব দীর্ঘস্থায়ী করতে দেশের বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের প্রধান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও প্রায় সাড়ে চার বছর আওয়ামী লীগের দলীয় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি দখলমুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ ও শিক্ষকতায় যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল, যার ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমান সরকার এসব অভিযোগকে গুরুত্বের সাথে দেখছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, “বিগত সরকারের সময় দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাকর্মীরা হাইজ্যাক করে নিয়েছিল। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। এখন আগের সেই লুটপাট আর চলবে না।”

শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারাই ট্রাস্টির সদস্য হবেন। তার দাবি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় এ ধরনের নিয়ম আগে ছিল এবং ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের সময় সেভাবেই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু বিগত সরকারের সময় আইন পরিবর্তন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দখলের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, ভিসি নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্থায়ী ক্যাম্পাস, শিক্ষক নিয়োগ এবং সনদের বৈধতা- সব ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই খাতের সঙ্কট কাটানো কঠিন হবে।