- ৩ দিনে ২০ পয়েন্ট দিয়ে ১৮৫ জনের অনুপ্রবেশ চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি ও গ্রামবাসী
- মাধবপুর, হবিগঞ্জ, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে রাতেও পুশইনের অপেক্ষায় শত শত মানুষ
- সীমান্তে বুলেটের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যারিকেড শক্তিশালী : ব্রিগেডিয়ার (অব:) সাখাওয়াত
- নয়াদিল্লিতে আজ ডিজি পর্যায়ের বৈঠক; গুরুত্ব পাবে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা ইস্যু
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপড়েনের মাঝেই সীমান্তজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতের অভ্যন্তর থেকে বাংলাভাষী মুসলিম ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার বা ‘পুশইন’ করার ধারাবাহিক অপচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এই অস্থিরতার সূত্রপাত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সাথে সমুদ্রসীমা ও উপকূলীয় অঞ্চলে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড।
গোয়েন্দা ও সীমান্ত সূত্রগুলোর তথ্যমতে, গত তিন দিনে দেশের অন্তত ২০টি সংবেদনশীল পয়েন্ট দিয়ে ১৮৫ জন ভারতীয় নাগরিকের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের যৌথ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই সংবেদনশীল যে, জিরো লাইনে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে যেকোনো মুহূর্তে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাতের আঁধারে অনুপ্রবেশের অপেক্ষা : থমথমে সীমান্ত : সর্বশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, হবিগঞ্জের মাধবপুর এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে শত শত বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছাকাছি এনে জড়ো করা হয়েছে। গতকাল রোববার রাতেও এই সীমান্তগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল।
বিজিবি সদর দফতর জানিয়েছে, পুশইন রুখতে সারা দেশে সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁঁকিপূর্ণ এবং কাঁটাতারহীন এলাকাগুলোতে ২৪ ঘণ্টা টহল সচল রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে ‘প্রতিরোধ ব্যূহ’ তৈরি করা হয়েছে।
পুশইন সঙ্কটের নেপথ্যে : বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন “ নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পুশইন চেষ্টা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক কৌশল ও এজেন্ডা রয়েছে। বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম সীমান্ত পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্ত রাজ্যগুলোর স্থানীয় সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। একে ঢাকার নতুন সরকারের ওপর এক ধরনের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বিএসএফের এই পুশইন চেষ্টা স্রেফ কোনো সাধারণ সীমান্ত অপরাধ নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় এজেন্ডার অংশ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এবারের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বিজিবির অনমনীয় ও কঠোর অবস্থান এবং এর সাথে স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সীমান্তে বুলেটের চেয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যারিকেড অনেক বেশি শক্তিশালী। বিজিবি যদি এই মুহূর্তে এক চুলও ছাড় দেয়, তবে ভারত এটিকে চিরস্থায়ী নজিরে পরিণত করবে।’
একই প্রসঙ্গে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশলগত চাপের অংশ হিসেবে এই পুশইনের ঘটনা ঘটছে। ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে প্রায়ই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ কার্ড খেলা হয়। সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা বানিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করার এই চেষ্টা ঢাকার ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অপপ্রয়াস। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কারো জাতীয়তা নিশ্চিত না করে এভাবে জোরপূর্বক পুশইন করা সম্পূর্ণ বেআইনি।’
আজ নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের বৈঠক
সীমান্তের এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (৮ জুন) থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন। এবারের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের এই অবৈধ পুশইন এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উত্থাপন করা হবে।
রোববার (৭ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা আমরা শক্ত হাতে প্রতিহত করব। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে এই পুশইন এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে ভারতের সাথে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট আলোচনা হবে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি।’
ডিজি পর্যায়ের এই বৈঠকে পুশইন ছাড়াও ভারতীয় দুষ্কৃতকারী কর্তৃক সীমান্ত অপরাধ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান রোধ, মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ এবং তিনবিঘা করিডোর দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনের মতো বিষয়গুলো এজেন্ডায় রয়েছে। এ ছাড়া, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল সম্পর্কে নেতিবাচক অপপ্রচার বন্ধের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে তোলা হবে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র : দেশের বিভিন্ন সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি
ভারতের এই পুশইন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তগুলোতে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত প্রতিরোধের চিত্র তুলে ধরা হলো :
১. ঠাকুরগঁাঁও : খোলা আকাশের নিচে গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জন
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ভারতের কলকাতার একটি স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ত ১২ বছরের কিশোরী রোজিনা আক্তার। বাবা-মা আর পাঁচ ভাইবোন নিয়ে সেখানে তাদের জীবন ভালোই কাটছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আটক করে এবং বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা চালায়।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুন দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে মশালগাঁও বিওপির সীমান্ত পিলার ৩৪৯/৭-এস এর কাছে বিএসএফ এই ১১ জন বাংলাভাষীকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। খবর পেয়ে বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের পুশইন প্রতিহত করে। এই দলে তিনজন পুরুষ, চারজন নারী এবং চারজন শিশু রয়েছে, যার মধ্যে একজন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারী ও একজন প্রতিবন্ধী শিশুও আছে।
বিজিবির অনমনীয় অবস্থানের কারণে গত ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত) এই অসহায় মানুষেরা দুই দেশের সীমান্তের শূন্যরেখার (নো ম্যান্স ল্যান্ড) খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে, খাওয়া ও গোসল ছাড়া চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। স্থানীয় গ্রামবাসীরা মানবিক কারণে কিছু শুকনো খাবার দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
২. তীব্র রোদ, বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তায় ৬০ ঘণ্টা : পঞ্চগড় সীমান্তে ১০ জনের মানবেতর জীবন
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জন ব্যক্তি ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে আটকে রয়েছেন। বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করার অপচেষ্টাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই চরম সঙ্কটের এখনো কোনো সমাধান হয়নি। খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় কাটানোয় এই মানুষগুলো অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
গতকাল রোববার দুপুরে সীমান্তে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, তীব্র রোদের মধ্যেও ওই ১০ জন একই স্থানে অবস্থান করছেন। সীমান্তসংলগ্ন একটি কর্দমাক্ত ও পানি জমে থাকা কৃষিজমিতে নারী, পুরুষ ও শিশুরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন। মাথার ওপর কোনো ছাউনি না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে রোদ, বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ফলে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁঁকি ও দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আটকে পড়া দলটিতে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী এবং তিনজন শিশু রয়েছেন। গত শুক্রবার (৫ জুন) ভোর থেকে তারা সীমান্তসংলগ্ন ওই জমিতে অবস্থান করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার রাতে সীমান্ত এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির সময়ও নারী ও শিশুদের নিয়ে ওই ব্যক্তিরা একই স্থানে ভিজতে বাধ্য হন, কারণ তাদের জন্য কোনো ধরনের অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়া-দাওয়া ও গোসল ছাড়া খোলা মাঠে থাকায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
সীমান্তের দায়িত্বশীল সূত্র জানান, গত শুক্রবার ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ওই ১০ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর অবস্থান নিয়ে তা প্রতিহত করে। বিজিবির অনমনীয় বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি। বর্তমানে তারা শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরেই অবস্থান করছে।
ঘটনার পর থেকে সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এই সঙ্কট নিরসনে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সুরাহা মেলেনি। সর্বশেষ গত শনিবার দুপুরে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে প্রায় ২০ মিনিটের একটি ফ্ল্যাগ মিটিং অনুষ্ঠিত হলেও বিএসএফের অনমনীয়তার কারণে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সিরাজুল ইসলাম জানান, ৯৩ বিএসএফের কমান্ডারের সাথে বৈঠকে তিনি ওই ব্যক্তিদের ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত নেয়ার জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে বিএসএফ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিজিবি অধিনায়ক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এভাবে জোরপূর্বক পুশইন করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি তাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকে, তবে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় থাকা এই ব্যক্তিদের মানবিক দুর্ভোগের বিষয়টিও আমরা বিএসএফকে জানিয়েছি এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।’
সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইন ঠেকাতে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী যৌথভাবে নি-িদ্র নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।
দিনাজপুর বিজিবি (৪২ ব্যাটালিয়ন) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে দুই দফা পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, দমদম এলাকা থেকে তাদের আটক করে বিএসএফের বহরগঁাঁও ক্যাম্পে আনা হয়েছিল। আমরা কূটনৈতিক ও সীমান্ত নিয়মানুযায়ী এটি সমাধানের চেষ্টা করছি। সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে।’
৩. হিলি সীমান্ত : লাঠি হাতে গ্রামবাসী ও গ্রাম পুলিশ
হাকিমপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুর হিলি সীমান্তে বিএসএফের যেকোনো ধরনের পুশইন ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশাপাশি লাঠি হাতে পাহারায় নেমেছেন স্থানীয় গ্রামবাসী ও গ্রাম পুলিশ সদস্যরা। সম্প্রতি শনিবার ভোররাতে হিলির ঘাসুড়িয়া সীমান্ত দিয়ে পাঁচ জন ভারতীয় নাগরিককে পুশইন করার চেষ্টা বিজিবি ও গ্রামবাসীর বাধায় ব্যর্থ হওয়ার পর এই যৌথ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়।
জয়পুরহাট ২০ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল লতিফুল বারী বলেন, ‘বিএসএফ অনেক সময় অঘোষিতভাবে সাধারণ মানুষদের হঠাৎ করেই সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। আমাদের এলাকায় সচেতনতার কোনো অভাব নেই। আমরা আনসার, গ্রাম পুলিশ এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা দল গঠন করেছি, যারা বিজিবির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাতদিন সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে।’
স্থানীয় গ্রামবাসী ফিরোজ হোসেন ও শরিফুল ইসলাম জানান, ‘ওপার থেকে যেন কোনো মানুষ অবৈধভাবে আমাদের দেশে ঢুকতে না পারে এবং দেশের নিরাপত্তা বিঘিœত না হয়, সেজন্য আমরা গ্রামবাসীরা লাঠি হাতে রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছি। বিজিবি পাশে থাকায় আমরা সাহস পাচ্ছি।’
৪. রৌমারী সীমান্ত : মধ্যরাতের অপচেষ্টা নস্যাৎ
রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বকবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের কঠোর অবস্থানের মুখে ব্যর্থ হয়েছে। রোববার (৭ জুন) রাত ১২টা ৩০ মিনিট থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ১০৬৯ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারের কাছে ৫ নম্বর যাদুরচর ইউনিয়নের বকবান্ধা সীমান্তে এই ঘটনা ঘটে।
জামালপুর ব্যাটালিয়নের (৩৫ বিজিবি) অধীন খেওয়ারচর বিওপির সদস্যরা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে মধ্যরাতে সীমান্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিজিবি ও জনগণের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে বিএসএফ শেষ পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
৫. হালুয়াঘাট : বিজিবির কড়া প্রতিরোধে ভেস্তে গেল বিএসএফের পরিকল্পনা
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয় জানায়, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে আবারো ‘পুশইন’ নাটক সাজাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে বিএসএফের বাবুরামবিল ক্যাম্পের সদস্যরা। শনিবার (৬ জুন) ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন চেরাংপাড়া এলাকা দিয়ে ৫-৬ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পরিকল্পনা নেয় বিএসএফ।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আগেভাগেই বিষয়টি টের পেয়ে রামচন্দ্রকুড়া বিওপির বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে জিরো লাইনে অবস্থান নেন। বিজিবির এই কঠোর তৎপরতায় বিএসএফের অপচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়। ৩৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: নুরুল আজিম বায়েজীদ বলেন, ‘সীমান্তে কোনো ধরনের পুশইন বরদাশত করা হবে না। মানবপাচারকারী বা দালাল চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে।’
৬. সিলেট ও জামালপুর সীমান্ত : নি-িদ্র নিরাপত্তা ও প্রচারণা
সিলেট ও বকশীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিলেট সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ৪৮ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন। সীমান্তজুড়ে ড্রোন সার্ভাইলেন্স এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে সীমান্তে সচেতনতামূলক মাইকিং ও গণসংযোগ করা হচ্ছে।
অনুরূপভাবে, জামালপুরের ৩৫ বিজিবির আওতাধীন বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর ও সাতানী পাড়াসহ ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় দিনরাত নি-িদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, স্থানীয়দের শূন্য রেখায় প্রবেশ না করতে সচেতন করা হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত এই সীমান্ত দিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
কোস্টগার্ডের নৌ সীমান্তে নজরদারি
শুধু স্থল সীমান্তই নয়; নদী ও সমুদ্রপথে পুশইন ঠেকাতে নদীভিত্তিক সীমান্ত এলাকায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সুন্দরবনসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে টহল জোরদার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোস্টগার্ডের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় কোনো পুশইনের ঘটনা ঘটেনি এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে কোস্টগার্ড সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের এই আগ্রাসী ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী পুশইন তৎপরতা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। জোরপূর্বক নাগরিক ঠেলে দেয়ার এই চেষ্টা আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চরম লঙ্ঘন। আজকের ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে ভারতের এই একপক্ষীয় নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যদি শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তুলে ধরে, তবে ভারত এই ব্যাকফুট পরিস্থিতি থেকে সীমান্ত যুদ্ধ বা বড় কোনো দ্বন্দ্বে জড়ানোর ঝুঁঁকি নেবে না। তাই এই মুহূর্তে কূটনৈতিক ও মাঠপর্যায়ে কঠোর অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।



