আপিল বিভাগের রায়ে কোটা বাতিল, তবু থামেনি সহিংসতা

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition
আপিল বিভাগের রায়ে কোটা বাতিল, তবু থামেনি সহিংসতা
আপিল বিভাগের রায়ে কোটা বাতিল, তবু থামেনি সহিংসতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

টানা কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কারফিউ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ও অচলাবস্থার মধ্যে ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সবার দৃষ্টি ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। আশা করা হয়েছিল, সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের নিষ্পত্তি পরিস্থিতিকে শান্ত করবে। কিন্তু আদালতের রায়ের পরও সংঘর্ষ থামেনি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিলের শুনানি শেষে সর্বসম্মত রায়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় সম্পূর্ণ বাতিল (রদ ও রহিত) করেন। আদালত নির্দেশ দেন, সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। বাকি ৭ শতাংশ কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে। নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই পদ সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে বলেও নির্দেশ দেয়া হয়। একই সাথে সরকারকে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। রায়ে আরো বলা হয়, প্রয়োজনে সরকার নির্বাহী ক্ষমতাবলে কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে।

আদালতের রায়ের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম রায়কে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেন। আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়া হয়। তাদের চার দফা দাবি ছিল কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট চালু, বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে ২২ জুলাই দেশব্যাপী গায়েবানা নামাজে জানাজার কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।

তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫৬ সমন্বয়কের নামে প্রচারিত এক যৌথ বিবৃতিতে আবার ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি জোরদারের আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, আদালতের রায়ের মাধ্যমে সহিংসতায় নিহতদের বিচার ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নের সমাধান হয়নি এবং আটক সমন্বয়কদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এতে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

এ দিকে চতুর্থ দিনের মতো সারা দেশে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ছিল এবং কারফিউ বহাল ছিল। সাধারণ ছুটির কারণে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, পোশাক কারখানাসহ বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। কিন্তু কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, বাড্ডা, কুড়িল, রামপুরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে গুলিবর্ষণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর বাইরে নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও চট্টগ্রামেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ দিন সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে অন্তত ১২ জন নিহত হন। আগের দিন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরো সাতজনের মৃত্যু হলে দিনের মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ জনে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন, নরসিংদীতে চারজন, গাজীপুরে দুইজন এবং নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও চট্টগ্রামে একজন করে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। কয়েক শ’ মানুষ আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। একই দিনে সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৯টি যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

দিনটির আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের ফিরে আসা। ১৯ জুলাই গভীর রাতে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। দুই দিন পর ২১ জুলাই ভোরে তাকে পূর্বাচল এলাকায় চোখ বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তাকে আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়া হয়নি।

অন্য দিকে, সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নিপুণ রায় এবং গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রামপুরায় বিটিভি ভবনে অগ্নিসংযোগ, সেতু ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ৫৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়, যার মধ্যে ঢাকায় গ্রেফতার হন প্রায় ২০০ জন।

দিনের শেষে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, ২২ জুলাইও কারফিউ বহাল থাকবে, তবে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিথিল করা হবে। একই রাতে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।

২১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দেয়, আপিল বিভাগের রায়ে কোটা-সংক্রান্ত আইনি বিরোধের অবসান হলেও আন্দোলনের রাজনৈতিক ও মানবিক সঙ্কট তখনো কাটেনি। সহিংসতা, প্রাণহানি, কারফিউ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আন্দোলনের দাবিও কোটা সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে বিচার, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার প্রশ্নে বিস্তৃত হয়। ফলে ২১ জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন একটি দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে, যেদিন আদালতের রায় এলেও রক্তপাত থামেনি।