সাভার (ঢাকা) উপজেলা সংবাদদাতা
আজ ২১ জুলাই, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাভারবাসীর জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় দিন। ২০২৪ সালের এ দিন রোববার ছিল। এদিন কারফিউ অমান্য করে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বিক্ষোভ ও কেন্দ্র ঘোষিত সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিতে (কমপ্লিট শাটডাউন) অংশ নেন।
এ দিন সকাল থেকেই ঢাকা জেলার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) বর্তমানে কারাবন্দী আবদুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে মহাসড়ক থেকে ছাত্র-জনতার ওপর দফায় দফায় গুলি চালানো হয়। সড়ক মহাসড়ক থেকে তাদেরকে হটিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বেশ আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে যৌথভাবে শক্তি প্রদর্শন এবং সশস্ত্র মটরসাইকেল শোডাউন করে। সড়ক মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। তারা সাঁজোয়া গান (এপিসি) জলকামানসহ ৩০-৩৫টি গাড়ি বহর নিয়ে সাভার ও আশুলিয়ায় কড়া পাহাড়া দিতে থাকে। তাদের সাথে ছিল দোসর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের মটরসাইকেল মহড়া।
এক পর্যায়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ড ও পাকিজা মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সাথে আন্দোলনকারীদের তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের গুলিতে এ দিন ছয়জন শহীদ হন। দুপুরের পর থেকে রাতভর সাভার পৌর এলাকায় প্রায় অর্ধশত বিএনপি নেতা ও সাংবাদিকদের বাড়ি-ঘরে লুটপাট চালায়।
পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী আন্দোলনকারী ও নিরীহ পথচারীসহ শতাধিক ব্যক্তিকে এ দিন পুলিশ আটক করে কারাগারে পাঠায়। এর আগের দিন ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাঁচাবাজারে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিতে মুরগীর দোকানি কুরবান শেখ ও ফারুক হোসেন শহীদ হন। আহত হন প্রায় অর্ধশত।
২১ জুলাই সকাল থেকে বিক্ষোভ দমাতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শত শত ছাত্র-জনতা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পাঁচ শতাধিক সন্ত্রাসী ও পুলিশকে বেশ ধরাশায়ী করে ফেলে। থানা বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, সাভার বাসস্ট্যান্ড, শিমুলতলা, রেডিও কলোনি, বিশমাইল, পল্লীবিদ্যুৎ, পলাশবাড়ী, বাইপাইল, জামগড়াসহ সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এ দিন পুলিশ অহরহ শটগান ও ছররা গুলি চালায়। বিভিন্ন পয়েন্টে গুলিতে ছয়জন শহীদ হন। দুপুরের পর থেকে পুলিশ সাভার পৌর এলাকায় বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ভিন্নমতের ব্যক্তিদের বাসা ও অফিসে লুটপাট চালানো হয়।
ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর খোরশেদ আলম জানান, ২১ জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাকে না পেয়ে পৌর এলাকায় ছায়াবিথী মহল্লায় তার শ্বশুর শহীদুল্লা কায়সারের বাসায় অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তার বাসায় থাকা ভেটেরিনারি ওষুধ ব্যবসার নগদ ৩৪ লাখ টাকা, খোরশেদ আলমের স্ত্রীর গলায় থাকা স্বর্ণের চেইনসহ ২১-২২ ভরি স্বর্ণ, টিভি, ফ্রিজ, মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়। এ ছাড়া গুলি করে বাসার এসি, পানির পাম্প, ফ্যান, ওয়াশরুমের কমডসহ নানা আসবাবপত্র ঝাঁঝরা করে দেয়। খোরশেদ আলম আরো জানান, ফ্রিজের মাছ, মাংস পাশের পুকুরে ফেলে দেয় পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা। একই কায়দায় পুলিশ রেডিও কলোনি এলাকায় পৌর বিএনপি নেতা সোহরাব হোসেন, সাইফুর রহমান, মজিদপুর এলাকায় পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর সাবেক কাউন্সিলর আবদুর রহমানের বাসায় লুটপাট চালায়। একই রাতে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলার রাজনৈতিক সেক্রেটারি হাসান মাহবুব মাস্টারের বাসায়ও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।
বিএনপি নেতা আবদুর রহমানের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার রুমীর ৪০ ভরি স্বর্ণ, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন লুটে নেয়। পুলিশ বাসার টিভি, ফ্রিজ, এয়ারকুলারসহ বিভিন্ন তৈষজপত্র ভেঙে তছনছ করে। লুটপাটকারীরা এ বাড়িতে মদ্যপান শেষে দু’টি খালি বোতলসহ বিভিন্ন মাদক সেবনের আলামত ফেলে যায়। তারা একই কায়দায় সাভার বাসস্ট্যান্ডে সিটি সেন্টার ভবনে থাকা সাভার পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ী নেতা ওবায়দুর রহমান অভির বাসায় লুটপাট চালায়। ওবায়দুর রহমান অভি জানান, রাতের আঁধারে তালাবদ্ধ বাসায় ৭০-৮০ জন পুলিশ ঢুকে বাসার টিভি, ফ্রিজসহ যাবতীয় তৈজসপত্র ও পার্কিংয়ে থাকা দু’টি গাড়ি ভাঙচুর করে কোটি টাকার ক্ষতিসাধন ও লুটপাট করে। এক পর্যায়ে পুলিশ তার বাসার পাশের প্রতিবেশীদের কাছে অভির বাবা-মায়ের সন্ধান করে। তারা একই দিনে আইচানোয়াদ্দায় যুবদল নেতা ইউনুস খান ও তার ছেলে পৌর ছাত্রদল নেতা নাঈম খানের বাড়িতে হামলা চালায় এবং ভাঙচুর ও লুটপাট করে।



