রফিকুল হায়দার ফরহাদ
‘এই মসজিদে জুমার নামাজ শেষ, চলেন আরেক মসজিদে যাই।’ কানাডার টরন্টো সফরে এমন আহ্বানই যেন শহরটির নতুন বাস্তবতার পরিচয় দেয়। স্থানীয় প্রবাসী ব্যবসায়ী আরিফুর রহমান মিলনের সাথে ড্যানফোর্থ এলাকায় এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে যেতে যেতে বিস্ময় জাগে- কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই এতগুলো মসজিদ! তার ভাষ্য, ড্যানফোর্থ এলাকায় অল্প দূরত্বের মধ্যেই তিন-চারটি মসজিদ রয়েছে। কোনো কোনো মসজিদে বিপুল মুসল্লির কারণে জুমার দিনে তিনটি পর্যন্ত জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ড্যানফোর্থ ইসলামিক সেন্টারে জুমার নামাজ শেষে কয়েক শ’ মিটার দূরেই বায়তুল আমান জামে মসজিদ। এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ও খতিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, পুরো টরন্টো শহরে বর্তমানে প্রায় ১২০টি মসজিদ রয়েছে। পাশাপাশি আরো প্রায় ৬৫টি মুসাল্লা রয়েছে, যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হলেও জুমার জামাত হয় না। মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে।
বায়তুল আমান জামে মসজিদের ইতিহাস ব্যতিক্রমধর্মী। এটি ছিল একটি নাইট ক্লাব। একটি হত্যাকাণ্ডের পর ভবনটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় প্রায় ২০ লাখ কানাডিয়ান ডলারে ভবনটি কিনে মসজিদে রূপান্তর করে। ২০০৮ সালের আগস্টে প্রথম জুমার নামাজের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় বায়তুল আমানের।
এখানে একসাথে ৩০০ থেকে ৪০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটি এখন ঋণমুক্ত। এর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। চারতলা নতুন ভবনে জিমনেশিয়াম, কমিউনিটি হল, সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের স্থান এবং শিক্ষাকার্যক্রমের ব্যবস্থা থাকবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ কানাডিয়ান ডলারের প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সম্প্রসারণের জন্য পাশের একটি জমি কেনা হয়েছে।
শুধু নাইট ক্লাব নয়, টরন্টোতে অনেক গির্জাও মসজিদে রূপান্তরিত হচ্ছে। স্কারবোরোতে বসবাসকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক বাহাউদ্দিন জানান, আগে জুমার নামাজ আদায়ে বাসে করে অনেক দূরে যেতে হতো। পরে স্থানীয় মুসলিমরা একটি গির্জা কিনে মসজিদে রূপান্তর করায় বাসার কাছেই নামাজ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের মতে, কানাডায় নতুন প্রজন্মের অনেক খ্রিষ্টান ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে অনেক গির্জায় উপাসনাকারীর সংখ্যা কমে গেছে এবং আর্থিক সঙ্কটে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায় সেই ভবনগুলো কিনে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে রূপান্তর করছে। যেখানে একসময় রোববারের প্রার্থনা হতো, সেখানে এখন প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন শিক্ষা এবং ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
টরন্টোর অধিকাংশ মসজিদই শুধু নামাজের স্থান নয়; বরং কমিউনিটি কার্যক্রমের কেন্দ্রও। শিশু-কিশোরদের জন্য ইসলামিক শিক্ষা, আরবি ভাষা শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা, পারিবারিক পরামর্শ এবং নতুন মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হয়।
বায়তুল আমান মসজিদের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রবাসে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে যুক্ত রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ইমাম কামরুজ্জামানের তথ্য অনুযায়ী, এই মসজিদের দাওয়াহ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২০ জনের বেশি কানাডীয় নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
প্রবাসীরা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ থেকে টরন্টোতে নতুন অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ভারত, লেবানন, তুরস্ক, বসনিয়া, আলবেনিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও মুসলিম অভিবাসীরা আসছেন। ফলে নতুন মসজিদের প্রয়োজনও বাড়ছে।
মুসলমানরা কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জনগোষ্ঠী। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ মুসলিম। ১৮৭১ সালে মাত্র ১৩ জন মুসলমানের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে কানাডায় ইসলামের যাত্রা। ১৯৩৮ সালে এডমন্টনে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম মসজিদ। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অভিবাসন এবং ১৯৬০-৭০-এর দশকের অভিবাসন প্রবাহে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ে।
আজকের টরন্টোতে ছোট-বড় মসজিদ গড়ে উঠেছে। কোনোটি অভিবাসী বাংলাদেশীদের উদ্যোগে, কোনোটি আরব, তুর্কি, পাকিস্তানি কিংবা আফ্রিকান মুসলিমদের প্রচেষ্টায়। মহাসড়কের পাশে সুউচ্চ মিনারওয়ালা মসজিদের পাশাপাশি বিভিন্ন শপিং প্লাজায়ও গড়ে উঠেছে ইসলামিক সেন্টার। অনেক মসজিদে হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
ধর্মীয় পরিচয় সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে ইসলামী মূল্যবোধের সাথে যুক্ত রাখা এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে মুসলিম কমিউনিটির সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার ক্ষেত্রে এসব মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ কারণেই খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কানাডার টরন্টো কেবল বহুজাতিক মানুষের শহর নয়, উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রাণবন্ত মুসলিম নগরী হিসেবেও নতুন পরিচয় গড়ে তুলছে।



