দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়া দীর্ঘ দুই মাস ধরে স্থবির হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং পুরনো আইন কোনোটারই এখন দুদক কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা নেই। আইনি জটিলতার ফলে দুদকের কমিশন গঠন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত মার্চ মাসের ৩ তারিখ দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের পর থেকেই মূলত শূন্যতা ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দুদকের কমিশন শূন্য হলে আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দুই মাস পার হওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর মাধ্যমে কমিশন পাঁচ সদস্যের করার উদ্যোগ নিলেও, পুরনো আইন ও নতুন সংশোধনী নিয়ে জটিলতায় নতুন কমিশন গঠন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারকের নেতৃত্বে একটি বাছাই কমিটি গঠনের কথা থাকলেও তা সময়মতো সক্রিয় হয়নি।
ফলে দুদকে নেমে এসেছে স্থবিরতা। কমিশন না থাকায় দুদকের স্বাভাবিক কার্যক্রম, অনুসন্ধান ও মামলার অনুমোদন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অনুসন্ধান, মামলা, চার্জশিট কিংবা অভিযুক্তদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এসব গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ৩ মার্চ মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাফিজ আহসান ফরিদ। এর পর থেকে নেতৃত্বশূন্য স্বাধীন সংস্থাটি। এতে থমকে গেছে ভিভিআইপি ও ভিআইপির দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম। এ অবস্থায় কবে কিভাবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার, এই অপেক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) ২০২৫ অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন সরকার।
এদিকে কমিশনের অনুপস্থিতিতে নতুন মামলা, চার্জশিট, আসামি গ্রেফতার কিংবা দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোকের মতো নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীরা। একদিকে আইনি জটিলতা আর অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্বাধীন এই সংস্থাটি এখন কার্যত অচল হয়ে আছে।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানামুখী জটিলতায় দুদকের কমিশন গঠনের ধারাবাহিকতায় বারবার ছন্দপতন ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনকে মেয়াদের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, মো: বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনগুলো তাদের নির্ধারিত সময় পূর্ণ করতে পারলেও সেই সৌভাগ্য হয়নি বাকিদের।
বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করা ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান, অনুসন্ধান ও তদন্তে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছে মোমেন কমিশন। এই অল্প সময়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগের বিপরীতে মামলা ও চার্জশিটে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুদকের জালে ফেঁসেছেন। যার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার, ওই সরকারের প্রায় সব মন্ত্রী, সাবেক আমলা ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা রয়েছেন। একই সময়ে দেশে ও বিদেশে অর্থপাচারকারী ও ঋণখেলাপিদের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান থাকলেও কমিশন না থাকায় বর্তমানে সম্পদ ক্রোক, নতুন মামলা, আসামি গ্রেফতার ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কাজ বন্ধ রয়েছে। কমিশন না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা। নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করাও সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দুদকে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।
মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর ইতোমধ্যে দুই মাস পার হয়ে গেলেও নতুন কমিশন গঠনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, কোনো কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এমনকি নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ ‘সার্চ কমিটি’ও এখনো গঠন করা হয়নি, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতাই এই বিলম্বের মূল কারণ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ সরাসরি সংসদে অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে দুদকের ভবিষ্যৎ। আর এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে থমকে আছে সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া, যা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগকে আরো দীর্ঘায়িত করার শঙ্কা তৈরি করেছে।
দুদক আইন অনুযায়ী, অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা করা, আসামি গ্রেফতার, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা কিংবা বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেবল কমিশনের। ফলে এই অভিভাবকহীন অবস্থায় দুদকের সব অভিযান ও আইনি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কমিশন-শূন্যতা কার্যত দুর্নীতিবিরোধী দেশের একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানটিকে থমকে রেখেছে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক একপ্রকার অচল। গত দেড় বছরে দুদক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবিরোধী ড্রাইভ দিয়েছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা, চার্জশিট, জব্দ করেছে। এখন কমিশন অনুমোদন না দিলে অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। এমনকি কমিশন না থাকায় আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার মতো পদক্ষেপও নেয়া যাচ্ছে না। এতে অভিযুক্তদের আত্মগোপন বা দেশত্যাগের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক আইনে নির্ধারিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় না। তবে কমিশন থাকার সময় যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলো চলমান রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে ‘জুলাই সনদে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই সনদের পাশাপাশি দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিত সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে অধ্যাদেশটি দ্রুত সংশোধন করে অবিলম্বে সংসদে আইন হিসেবে অনুমোদনের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, কমিশন না থাকায় দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বহীন দুদক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে সংস্থাটি একপ্রকার অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকার কী প্রক্রিয়ায় দুদক কমিশন গঠন করবে, তা তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। সংসদে অধ্যাদেশ পাস না হলে আগের নিয়মে কমিশন গঠন হতে পারে।



