প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘অসত্য’ বলা নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘অসত্য’ বক্তব্য দিয়েছেন-বিরোধীদলীয় জোটের শরিক এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদের দেয়া এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গতকাল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদ। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের পাল্টাপাল্টি যুক্তিতে সংসদে চরম হট্টগোল তৈরি হয়। একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এটি শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।’

গতকাল জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১১তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ প্রধানমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছেন- এমন অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আজ সংসদে নেই। তিনি বিভিন্ন ভাষণে বিরোধী দল সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, বিরোধী দল মদের দাম বা সিগারেটের দাম বাড়ানোর কারণে মিছিল করছে। এ ধরনের অসত্য তথ্য দিয়ে বক্তব্য দিলে আমরা খুবই আশাহত হই। ঋণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘আপনারা সবাই জমিদার, যারা ঋণ নেননি’, তখন তিনি মূলত ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছেন। আমরা এমন সংসদ চাই না, যেখানে প্রধানমন্ত্রী অসত্য তথ্য দেন।’

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘অবাস্তব’ ও ‘বিএনপিদলীয় সরকারের আকাক্সক্ষার দলিল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে হান্নান মাসউদ বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা পূরণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। রফতানি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। চার লাখ কোটি টাকা বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করছে, অথচ ব্যাংক খাত এখন চরম সঙ্কটে।” তিনি আরো বলেন, করমুক্ত আয়সীমা মাত্র ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো মধ্যবিত্তের ওপর একধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া কৃষি বরাদ্দ কমানোর ফলে দেশ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।

দেশে চলমান ‘মব কালচার’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাসসে মব সৃষ্টি করে কর্মকর্তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। সরকার ক্ষমতায় থাকতে কেন মবের আশ্রয় নিতে হচ্ছে? নিয়োগ বাতিল করলেই তো হতো।’

নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, গত চার মাসে ১১৮ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে এবং ১৭ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন শিবির নেতার প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে সংসদে বিবৃতি দিলেও তার নিজের আসনে মা-মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় কোনো কথা বলেননি।

সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আমরা এমন এক সংসদে আছি, যেখানে ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করে এসেছি। অথচ সীমান্ত হত্যা নিয়ে ভারতের দালালি যেভাবে আওয়ামী লীগ সরকার করত, বর্তমান সরকারও একইভাবে করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন সব সীমান্ত হত্যাকে হত্যা বলা যাবে না। আমরা বলছি প্রত্যেকটি সীমান্ত হত্যাই হত্যা এবং তা আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।’ বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নামকরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বর্তমানে একজন প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণের কড়া সমালোচনা করেন।

সরকারি ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি যুক্তি

তার বক্তব্যের পর অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন ফারুক বলেন, ‘আমরা সংসদকে কার্যকর করতে উভয় পক্ষ একটি সম্মতিতে এসেছি। সংসদে এমন কোনো অসত্য বাক্য উত্থাপন করা উচিত নয় যাতে কারো মানহানি হয়। নতুন প্রজন্মের একজন সংসদ সদস্য সংসদ নেতাকে নিয়ে কিছু বক্তব্য রেখেছেন যা অত্যন্ত ক্ষোভের। আমাদের নেতা উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। ১৬ বছর ধরে রাজপথে সংগ্রাম করে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে তিনি সরকার গঠন করেছেন। সংসদ নেতাকে নিয়ে দেয়া অসত্য বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানাচ্ছি।’

এরপর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, সংসদ সদস্য ঢালাওভাবে অসত্য বলেছেন এমন দাবি না করে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে কোন তথ্যটি ভুল ছিল। তিনি মূলত সংসদ নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। সংসদ নেতার সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীও মানুষ এবং বক্তব্য দেয়ার সময় উনারও ভুল বা ‘স্লিপ অব টাং’ হতে পারে। আমরা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি এবং কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের দিকে ফিরে যেতে চাই না।’ তাই স্পিকারকে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

এরপর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ যে কথাটা বললেন আমার মনে হয় এটা সত্য নয়, সঠিক নয়। কারণ আমাদের সংসদ সদস্য যে বক্তব্য দিয়েছেন সেই বক্তব্যের মধ্যে তিনি সুনির্দিষ্টভাবেই বলেছেন যে আমাদের সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। আপনারা ফ্যাসিষ্টের কথা বলেন, কিন্তু ফ্যাসিষ্ট আচরণ তো আপনাদের কাছ থেকেই আসছে। যে অংশটুকু অসত্য, তা দয়া করে এক্সপাঞ্জ করবেন।’

এ সময় সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ বারবার দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার তাকে সতর্ক করে বলেন, “আপনার সময় শেষ। এভাবে যখন খুশি তখন দাঁড়ানো সংসদের রীতি নয়। প্লিজ টেক ইয়োর সিট। এটা শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।’

এ সময় পরিস্থিতি শান্ত করতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘হান্নান মাসউদ সংসদ নেতার ব্যাপারে কিছু কথা বলেছেন। আমি অনুরোধ করব, বাইরের বিষয় টেনে এনে এখানে এক্সপাঞ্জ বা বক্তব্য দেয়া যেন অ্যালাউ না করা হয়। সংসদের ভেতরে সংসদীয় নর্মস থাকা উচিত। সত্য-অসত্যের এই ঝগড়ায় গেলে হয়তো অনেক কিছু লজ্জাজনক হয়ে যাবে। তাই পুরো বিষয়টি ইগনোর করাই আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে।’

সবশেষে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমরা সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে বিধি মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেবো।’

সংসদে মামুনুল হক বিষয়ে নিজের দেয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সম্পর্কে সংসদে নিজের দেয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গতকাল রোববার বিকেল ৩টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হলে স্পিকার এ কথা জানান।

এ সময় স্পিকার বলেন, ‘আমি গত বৃহস্পতিবার এক অধিবেশনে মাওলানা মামুনুল হক সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির ‘জীবনের অন্ধকার অধ্যায়’ বলে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তা এক্সপাঞ্জ করছি।’ একই সাথে ঢাকা-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক মাওলানা মামুনুল হক সম্পর্কে পরকীয়া বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটিও অনভিপ্রেত আখ্যা দিয়ে তা এক্সপাঞ্জ করেন স্পিকার। এ সময় স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি সংসদে নেই বা যে ব্যক্তির নিজের সংসদে এসে তার বিরুদ্ধে দেয়া বক্তব্য ডিফেন্ড করার সুযোগ নেই, তার বিষয়ে সংসদে কোনো বিরূপ মন্তব্য করা উচিত নয়। আপনারা কেউ তা করবেন না।

এ সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, “আল্লাহ গিবত করতে নিষেধ করেছেন। যিনি উপস্থিত নেই তার অনুপস্থিতিতে তার বিষয়ে বলা গিবত- সেটি যদি সত্যও হয়। আর বলা অভিযোগ যদি অসত্য হয় তবে তা তোহমত, যার গুনাহ জেনার থেকেও বেশি। এজন্য মাননীয় স্পিকার আপনি যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন তা সঠিক। আল্লাহ এ জন্য আপনাকে উত্তম বিনিময় ও বারাকাহ দান করুন।’

এর আগে বিএনপিদলীয় মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান গত দু’দিন আগে মুন্সীগঞ্জে এক জনসভায় বক্তব্যে ‘এই এলাকার মানুষও নাকি চাঁদাবাজির শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও তিনি আমার নাম উল্লেখ করেননি। তিনি এখন সংসদে নেই। তিনি থাকলে এ বিষয়ে তিনি কেন মুন্সীগঞ্জবাসীর ওপর এ অভিযোগ করেছেন তা জানতে চাইতাম।’

জবাবে স্পিকার বলেন, ‘এটা কোনো পয়েন্ট অব অর্ডার হলো না, পয়েন্ট অব অর্ডার হিসেবে গ্রহণ করা গেল না।’ তিনি আরো বলেন, দেশে বাকস্বাধীনতা রয়েছে। তা ছাড়া রাজনীতিবিদরা অনেক কথা বলেন। সংসদের বাইরে যে কথা, তা সংসদের বাইরে জবাব দেয়া যায়। সংসদে কোনো কথা বললে আপনার নাম উল্লেখ থাকলে তা ২৭৪ বিধিতে জবাব দিতে পারেন। তা ছাড়া আপনার এখানে ভ্যালিড কোনো অভিযোগ নেই। সংসদে আপনার নামে কোনো অভিযোগ করলে সংসদে তার জবাব দিতে পারেন। বাইরের বিষয় বাইরে থাকুক।

এ ছাড়াও সংসদের শুরুতেই কিশোরগঞ্জ-২ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিন বলেন, নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম তার পিতা জীবিত থাকার পরও তাকে শহীদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার এ বক্তব্য অসত্য এবং তা এক্সপাঞ্জ করা হোক।

এ সময় স্পিকার বলেন, ওই সংসদ সদস্য যেদিন বক্তব্য দিয়েছেন, ওই দিনই তিনি আমার সাথে দেখা করে তার ভুল স্বীকার করেছেন। এটা ছিল তার অনিচ্ছাকৃত ভুল এবং ‘স্লিপ অব টাং’। তিনি নিজেও পরে প্রকাশ্য বক্তব্যে ভুল স্বীকার করেছেন। এজন্য এটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে ইতিমধ্যেই এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে।

বিএনপি কোনো কওমের জন্য কাজ করে না: নিলোফার মনি

সরকারদলীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেছেন, “গত কয়েক দিন আগে বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, কওমি মাদরাসায় নাকি বরাদ্দ দেয়া হয়নি। আমি উনাকে বলতে চাই-কওমি অর্থ গোষ্ঠী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কোনো গোষ্ঠী বা কোনো ব্যক্তির জন্য কাজ করে না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও বাংলাদেশের নেতা জনাব তারেক রহমান সমগ্র বাংলাদেশের জন্য কাজ করেন।”

গতকাল বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

নিলুফার চৌধুরী মনি আরো বলেন, সংসদে তরুণদের ৮ জন প্রতিনিধি আছেন, কিন্তু তারা তরুণদের নিয়ে কোনো কথা বলেন না। তারা শুধু গণভোট নিয়ে কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, “একজন সংসদ সদস্য তার পিতা জীবিত থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেছেন। সংসদ সদস্য হতে হলে মুক্তিযোদ্ধা হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই, জনগণের জন্য কাজ করলেই হয়। কিন্তু তারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করতে অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন।’

এর প্রেক্ষিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, ওই সংসদ সদস্য যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল এবং তিনি নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন। এটি ছিল মূলত ‘স্লিপ অব টাং’। এর আগেও সংসদে এ নিয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।