স্টাটার পেনাল্টির কৌশল বুঝে গেছেন গোলরক্ষকরা

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে লিওনেল মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিচ্ছেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা সোবেইরি  : ইন্টারনেট
আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে লিওনেল মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিচ্ছেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা সোবেইরি : ইন্টারনেট

বাঁশি বাজতেই স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। লাখো দর্শকের গর্জন হঠাৎ করেই যেন থেমে যায়। ১২ গজ দূরে বলের পেছনে দাঁড়িয়ে একজন ফুটবলার। সামনে কেবল একজন গোলরক্ষক। বাইরে থেকে দৃশ্যটি যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে তখন চলছে স্নায়ু, মনস্তত্ত্ব আর বুদ্ধির এক অদৃশ্য যুদ্ধ। একসময় এই যুদ্ধের ফলাফল প্রায় নিশ্চিত ছিল পেনাল্টি মানেই গোল। কিন্তু আধুনিক ফুটবল সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।

আধুনিক ফুটবলে থমকে থমকে পেনাল্টি নেয়ার কৌশল কার্যকারিতা হারাচ্ছে? যদিও এই ‘স্টাটার রান-আপ’ অনেকে পছন্দ করেন না। সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট বলেন, ‘মনে হচ্ছে গোলকিপাররা এখন এই স্টাটার পেনাল্টির রহস্য ধরে ফেলেছেন।’

ফিফার নিয়মানুযায়ী, শট নেয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত ছাড়া রান-আপের যেকোনো পর্যায়ে গতি কমানো বা থামানো বৈধ। পেলে কিংবা উগো সানচেজরাও অতীতে এই মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা নিতেন। কিন্তু গোলকিপার যদি আগেভাগে ডাইভ না দেন, তবে এই কৌশল বুমেরাং হতে বাধ্য।

চলতি বিশ্বকাপে পরিসংখ্যানও কিন্তু ‘স্টাটার’ পেনাল্টির বিপক্ষে কথা বলছে। কাতার বা পূর্ববর্তী আসরগুলোর তুলনায় এবার পেনাল্টি মিসের মহড়া চলছে। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে নেয়া ২৬টি ‘স্টাটার’ পেনাল্টির মধ্যে ১১টিই মিস হয়েছে, যার সাফল্যের হার মাত্র ৫৭ শতাংশ। বিপরীতে সাধারণ বা প্রথাগত উপায়ে নেয়া ৩৫টি পেনাল্টির ২৪টিই জালে জড়িয়েছে, যার সাফল্যের হার ৬৮ শতাংশ।

মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের ২-০ গোলের জয় ছাপিয়ে এখন ফুটবল দুনিয়ায় বড় আলোচনা- কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিস। ফক্সবোরোয় ম্যাচের তখন গোলশূন্য দশা। নুসাইর মাজরাউই বক্সের ভেতর ফরাসি অধিনায়ককে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। কিন্তু শট নেয়ার আগমুহূর্তে এমবাপ্পের সেই চিরচেনা ‘স্টাটার’ বা থমকে যাওয়ার চাতুরী এবার কাজে আসেনি। মরক্কোর বাজপাখি ইয়াসিন বুনু সহজেই দুর্বল শটটি রুখে দেন! পরে দুর্দান্ত এক গোল করে এমবাপ্পে নিজের ভুল শুধরেছেন ঠিকই, তবে এই পেনাল্টি মিস একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। এমবাপ্পের মতোই এই কৌশলে এবার ব্যর্থ হয়েছেন ব্রুনো গিমারেস, লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেনের মতো তারকারা।

সাবেক স্কটিশ উইঙ্গার প্যাট নেভিনের মতে, ‘এটি আসলে আধুনিক ফুটবলের এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এখনকার গোলকিপাররা অনেক বেশি দীর্ঘকায় ও অ্যাথলেটিক। সাথে আছে চুলচেরা ডেটা অ্যানালাইসিস। কে কোন দিকে শট নিতে ভালোবাসেন, তা গোলকিপারদের মুখস্থ। তাই গোলকিপারকে বিভ্রান্ত করতেই স্ট্রাইকাররা গতি মন্থর করেন। কিন্তু বুনুর মতো দক্ষ কিপারের সামনে তা খাটেনি, যিনি বিশ্বকাপে ফেস করা ৯টি পেনাল্টির মাত্র ২টি হজম করেছেন।’

তবে এমবাপ্পের এই মিসের পেছনে কেবল কৌশল নয়, ভিএআরও দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফাউল থেকে শুরু করে শট নেয়া পর্যন্ত মাঝখানের ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ডের অপেক্ষা এমবাপ্পের মনোযোগ নষ্ট করেছে বলে মত ফরাসি সাংবাদিক জুলিয়েন লরেন্সের। সাবেক আইরিশ তারকা রয় কিনও মনে করেন, এত দীর্ঘ সময় একজন স্ট্রাইকারের স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে, যা সুবিধা এনে দেয় গোলকিপারকেই।

সময় বদলেছে। আধুনিক ফুটবলে পেনাল্টি আর একপক্ষীয় লড়াই নয়; বরং এটি এখন দুই মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব, দুই স্নায়ুর যুদ্ধ। চলতি বিশ্বকাপে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে স্ট্রাইকাররা কি আগের মতো দক্ষ নন, নাকি গোলরক্ষকরাই অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন?

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় পেনাল্টি হলো, ‘হাই-প্রেশার ডিসিশন টাস্ক’। মাত্র ১২ গজ দূরত্ব, কয়েক সেকেন্ড সময়, লাখো দর্শকের চোখ এবং কোটি মানুষের প্রত্যাশা। এই চাপের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চাপ খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অনেক স্ট্রাইকার শেষ মুহূর্তে নিজের পরিকল্পনা বদলে ফেলেন। বলের দিকে নয়, গোলরক্ষকের নড়াচড়ার দিকে মনোযোগ চলে যায়। আর সেখানেই জন্ম নেয় ভুল।

অন্য দিকে গোলরক্ষকদের প্রস্তুতিও বদলে গেছে আমূল। এখন আর তারা শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করেন না। ভিডিও বিশ্লেষকরা প্রতিটি পেনাল্টি নেয়া খেলোয়াড়ের অভ্যাস, রান-আপের গতি, শরীরের ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি, এমনকি কোন পরিস্থিতিতে কোন দিকে শট নেন, সব তথ্য সংগ্রহ করে দেন। ম্যাচের আগে অনেক গোলরক্ষকের হাতে ছোট নোট কিংবা পানির বোতলে লেখা থাকে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য শটের দিক; অর্থাৎ গোলরক্ষক এখন শুধু প্রতিক্রিয়া দেখান না, আগেভাগেই পরিকল্পনা করে নামেন।

তবে শুধু প্রযুক্তিই নয়, বদলেছে গোলরক্ষকদের মানসিক প্রস্তুতিও। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নেন, হাত নেড়ে বিভ্রান্ত করেন, দৃষ্টির লড়াইয়ে নামেন। এসবকে বলা হয় ‘সাইকোলজিক্যাল ডিসরাপশন’। যার লক্ষ্য শট নেয়া খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসে সূক্ষ্ম ফাটল ধরানো। এক মুহূর্তের সেই দ্বিধাই অনেক সময় পার্থক্য গড়ে দেয় গোল আর ব্যর্থতার মধ্যে।

তাহলে এই ব্যর্থতার দায় কার? বাস্তবতা বলছে, এটি কেবল স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং এটি আধুনিক গোলরক্ষকদের সাফল্যেরও গল্প। ফুটবল বিজ্ঞানের অগ্রগতি, তথ্য বিশ্লেষণ, মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার গোলরক্ষকদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, পেনাল্টি আর নিশ্চিত গোল নয়। হয়তো এটিই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। ১২ গজের দূরত্ব একই আছে, গোলপোস্টের আকারও বদলায়নি। বদলেছে মানুষ, প্রস্তুতি আর মানসিকতার যুদ্ধ। আজকের ফুটবলে পেনাল্টি শুধু একজন স্ট্রাইকারের শট নয়ম, এটি দুই মস্তিষ্ক, দুই স্নায়ু এবং দুই পরিকল্পনার চূড়ান্ত লড়াই।

বিখ্যাত ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীরা একটি বিষয় নিয়ে প্রায় একমত পেনাল্টির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক নন, বরং শট নেয়া খেলোয়াড়ের নিজের মস্তিষ্ক। অতিরিক্ত চাপ মানুষের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো খেলোয়াড় জানেন একটি শটেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হতে পারে, তখন তার মস্তিষ্ক অতি দ্রুত বিকল্প চিন্তা করতে শুরু করে। আর সেই অতিরিক্ত ভাবনাই নিখুঁত শটকে পরিণত করে ভুলে। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছেন আধুনিক গোলরক্ষকরা।

এর সাথে যোগ হয়েছে মানসিক খেলা। গোলরক্ষকের ধীর হাঁটা, লাইন ধরে নড়াচড়া, হাত নাড়া, দীর্ঘক্ষণ চোখে চোখ রাখা কিংবা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা এসবই প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাসে সূক্ষ্ম আঘাত হানার কৌশল।

স্টাটার বনাম নন-স্টাটারের এই দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে? গোলকিপারদের এই প্রযুক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের যুগে পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করাটা যে দিন দিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে, তা বলাই বাহুল্য।