১০ দিন টানা বৃদ্ধির পর পুঁজিবাজারে সংশোধন

বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচক ও লেনদেনের উন্নতিতে টানা ১০ দিন অতিবাহিত করার পর অবশেষে প্রত্যাশিত সংশোধন ঘটেছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে এসে এ সংশোধন ঘটে। এ সময় দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন ও সূচকের অবনতি ঘটে। দরপতনের শিকার হয় উভয় বাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া বেশির ভাগ কোম্পানি ও ফান্ড। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাজারের এ সংশোধন প্রত্যাশিত ছিল। রোববারের বাজার আচরণেও এর ইঙ্গিত ছিল। ওই দিন সূচক ৮০ পয়েন্ট ওঠার পর যখন ৪০ পয়েন্ট টিকল তখনই মনে হচ্ছিল সংশোধন আসন্ন। সে অনুযায়ী গতকাল লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৩ দশমিক ১৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৫১৬ দশমিক ১৫ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৮২ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে। লেনদেন শুরুর প্রথম ১৫ মিনিটেই বিক্রয়চাপে পড়ে সূচকটি নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৮২ পয়েন্টে।

এ পর্যায়ে প্রায় ৩০ পয়েন্ট অবনতি ঘটে সূচকের। এখান থেকে সাময়িকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হলেও বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তীব্র বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারটি। এ সময় ডিএসই সূচক নেমে আসে চার হাজার ৮৬২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে ৫৪ পয়েন্ট সূচক হারায় ডিএসই। তবে শেষদিকে এসে হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পেলে পাঁচ হাজার ৪৮২ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে স্থির হয়। এ সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর হারায় যথাক্রমে ১৮ দশমিক ০৪ ও ৭ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট।

সোমবার দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এর ৮৪ দশমিক ৭০ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ওই দিন সকালে ১৫ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি দিনশেষে ১৫ হাজার ৩১৪ দশমিক ৭২ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১১৪ দশমিক ৭৬ ও ৫৬ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল লেনদেনেরও অবনতি ঘটে দুই পুঁজিবাজারে। ঢাকা স্টক গতকাল এক হাজার ৭২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৫৭ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৫২৯ কোটি টাকা। দিনের শুরুতে বিক্রয়চাপের মুখে পড়ায় বাজারের গতি ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় যা শেষদিকেও বজায় ছিল। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার ৪৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে গতকাল যা আগের দিন অপেক্ষা ১৪ কোটি টাকা কম। রোববার বাজারটির লেনদেন ছিল ৫৭ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ১০ দিন টানা বৃদ্ধির পর বাজারে সংশোধন প্রত্যাশিত ছিল। কারণ এর আগে ডিএসইতে সূচকের উন্নতি ঘটেছে ৩০০ পয়েন্টের বেশি। আর চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে প্রধান সূচকটি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫০০ পয়েন্ট। অতএব এ পর্যায়ে বাজারে সংশোধন না ঘটলে তা স্বাভাবিক হতো না। কোন না কোনোভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারতো বাজার। এ সংশোধন আরো দু’একদিন ঘটতে পারে বলে মনে করেন তারা। তবে তারা আশাবাদী সংশোধন শেষ করে বাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

এদিকে পুঁজিবাজারে ফ্লোরপ্রাইসের জাঁতাকলে বন্দী থাকা দুই কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি অবশেষে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। গতকাল পুঁজিাবাজর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানি দু’টির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় যা আজ মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হচ্ছে। গতকাল কমিশনের জারি করা এক আদেশে আরো বলা হয়, বিধি মোতাবেক কোম্পানি দু’টির শেয়ার লেনদেনে সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে। গত ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্লোর প্রাইসে আটকে রয়েছে এ দুই কোম্পানি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর গত বৃহস্পতিবার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ফ্লোরপ্রাইস ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মো: মাসুদ খান। পাশাপাশি তিনি এ ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে কোনো পরিস্থিতিতেই আর ফ্লোরপ্রাইস আরোপ করা হবে না। এরপর রোববার সিএফএ সোসাইটির এক দশকপূর্তি অনুষ্ঠানেও তিনি এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

পরে গত রোববার (৭ জুন) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একটি প্রতিনিধিদল নতুন কমিশনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে গেলে তাদেরকে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়ার বিষয়টি জানিয়েছিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। ফ্লোর প্রাইস হলো শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সীমা, যার চেয়ে কম দামে শেয়ার কেনা বা বেচার কোনো আদেশ দেয়া যায় না। বর্তমানে বেক্সিমকোর শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ১১০ টাকা ১০ পয়সা এবং ইসলামী ব্যাংকের ফ্লোর প্রাইস ৩২ টাকা ৬০ পয়সা। এর আগে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে বেশ কিছুদিন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের লেনদেন হলেও পরবর্তীতে আবার একই জায়গায় এসে আটকে আছে। আর বেক্সিমকো লিমিটেডের লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে একই দরে আটকে আছে।

২০২০ সালে সারা বিশে^ করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব তীব্র আকার ধারণ করলে সারা বিশে^র মতো বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। দিনের পর দিন দরপতনের শিকার হতে থাকে পুঁজিবাজার। সে সময় দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ২০২০ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন বাজারে ফ্লোরপ্রাইস আরোপ করে।

পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হলেও ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকোর শেয়ারের ক্ষেত্রে তা বহাল ছিল। বিএসইসির সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ খান ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ফ্লোর প্রাইসের বিরুদ্ধে তার নীতিগত অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শেষ পর্যন্ত তিনিও বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেননি। অবশেষে সরকার গঠিত নতুন কমিশন গতকাল তা প্রত্যাহার করেছে।