শাহ আলম নূর জার্মানির বন থেকে
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। একদিকে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, অন্য দিকে বিশ্বের প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। গত তিন দশকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে অসংখ্য অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তবে বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ এখনো রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। কেমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো কি সত্যিই তাদের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে নাকি আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতি এখনো ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী দেশ গুলোর মধ্যে চীন বছরে ১২ বিলিয়ন টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে, যা বৈশ্বিক মোট নিঃসরণের প্রায় ৩১ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার বার্ষিক নিঃসরণ প্রায় ৫ বিলিয়ন টন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের নিঃসরণ ৩ বিলিয়ন টনেরও বেশি। এরপর রয়েছে রাশিয়া, জাপান, ইরান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়া। জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই ১০টি দেশ মিলেই বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী।
তবে বর্তমান নিঃসরণের পাশাপাশি ঐতিহাসিক দায়ও জলবায়ু আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমান জলবায়ু সঙ্কটের পেছনে ঐতিহাসিকভাবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর অবদান বেশি, তাই জলবায়ু অর্থায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় তাদের দায়িত্বও বেশি হওয়া উচিত।
তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯২ সালে জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) গৃহীত হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রটোকল শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য নির্গমন কমানোর বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে। পরে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে এবং সম্ভব হলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সাময়িকভাবে নিঃসরণ কমলেও অর্থনীতি পুনরায় চালু হওয়ার পর তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ৩৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন টনে পৌঁছায়। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৩৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন টন। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ নতুন রেকর্ড গড়ে এবং ২০২৪ সালেও নিঃসরণ কমার পরিবর্তে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের প্রধান নিঃসরণকারী দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চীন ২০৩০ সালের আগে কার্বন নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০৫ সালের তুলনায় ৫০ থেকে ৫২ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করেছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নেট-জিরো অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো অর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু নিরপেক্ষ অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ দেশ তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় গতিতে এগোতে পারছে না। উদাহরণ হিসেবে চীন এখনো বিশ্বের বৃহত্তম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদক। যুক্তরাষ্ট্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়লেও তেল ও গ্যাস উৎপাদন উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের বিদ্যুৎ খাত এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কয়লার ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া, সৌদি আরব ও ইরানের মতো দেশগুলোর অর্থনীতি ব্যাপকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের রূপান্তরের গতি আরো ধীর।
জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত এসবি-৬৪ জলবায়ু আলোচনায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ঘাটতির বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিল নিয়ে বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। অনেক প্রতিনিধি মনে করছেন, এবারের আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্জন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জোট এবং জি-৭৭ ও চীন গ্রুপের প্রতিনিধিরা বলছেন, তারা বহু বছর ধরে একই দাবি জানিয়ে আসছেন- অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর।
সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর হোসেন মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। ২০০৯ সালে উন্নত দেশগুলো বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোগ, এই অর্থের বড় অংশ ঋণ হিসেবে দেয়া হয়েছে এবং প্রকৃত সহায়তার পরিমাণ ঘোষিত অঙ্কের তুলনায় কম। একই সাথে অভিযোজন খাতে অর্থায়ন এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করলে তাদের বাধ্য করা যাচ্ছে না কেন। এর অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিগুলোর কাঠামো। প্যারিস চুক্তির অধীনে প্রতিটি দেশ নিজস্ব জাতীয় পরিকল্পনা (এনডিসি) নির্ধারণ করে। কিন্তু লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক শাস্তি বা জরিমানার ব্যবস্থা নেই। ফলে চুক্তিগুলো অনেকাংশে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় জলবায়ু প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে দেশগুলো জলবায়ু লক্ষ্য ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপস করে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে আরো কঠোর ও স্বচ্ছ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সাথে উন্নত দেশগুলোর অর্থায়ন প্রতিশ্রুতির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানীতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমানো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।
তিনি বলেন হয় এই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, নিরাপদ পানির সঙ্কট বাড়ছে এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বড় অংশ ঝুঁকির মুখে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও বাড়বে। কৃষি, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরো গভীর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সংশ্লিষ্টতা বলছেন, জলবায়ু সঙ্কট এখন আর শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো যদি তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশসহ সেইসব দেশকে, যারা সঙ্কট সৃষ্টিতে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেও এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।



