ক্রীড়া প্রতিবেদক
বুলাওয়েতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় টি-২০ ম্যাচটা ছিল মনস্তাত্ত্বিক। এই লড়াইয়ে টাইগাররা যেন তিনটি আলাদা গল্প লিখেছে। প্রথম গল্পে ছিল দাপট, দ্বিতীয়টিতে আতঙ্ক, আর শেষটিতে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। শুরুতে ব্যাট করে পাঁচ উইকেটে ১৮৬ রান টাইগারদের। জবাবে দুই বল বাকি থাকতে ১৫২ রানে অলআউট জিম্বাবুয়ে। সবমিলিয়ে ৩৪ রানের জয় শুধু সিরিজে ১-১ এ সমতায় ফেরায়নি বাংলাদেশ, ফিরিয়ে দিয়েছে নিজেদের ওপর হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসও! এখন সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণ হবে ১৯ জুলাই। তবে শেষ ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত স্কোরলাইন নয়। বাংলাদেশ এই সফরে এসে এখন জানে, তারা চাপ সামলাতে পারে!
প্রথম ম্যাচের পর চাপটা ছিল পুরোপুরি বাংলাদেশের কাঁধে। আরেকটি হার মানেই সিরিজ শেষ। তাই শুরু থেকেই ব্যাট হাতে ছিল ভিন্ন এক মানসিকতা। সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম যেন ঠিক করে নেমেছিলেন, প্রথম ম্যাচের ব্যর্থতার কোনো ছাপ রাখবেন না। একজন ইনিংস গড়েছেন ধৈর্যে, অন্যজন খেলেছেন আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। পাওয়ারপ্লেতে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৫৪ রান, এরপর শতরানের জুটি- সব কিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল, বাংলাদেশ বড় কিছুর দিকে এগোচ্ছে!
১২০ রানে গিয়ে যখন ওপেনিং জুটি ভাঙল, তখন মনে হচ্ছিল ২০০ রানের স্বপ্নও অসম্ভব নয়। কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটি সামনে এলো ঠিক এরপরই। হঠাৎ যেন সুইচ অফ হয়ে গেল বাংলাদেশের ব্যাটিং। একের পর এক ব্যাটার আসছেন, ফিরেও যাচ্ছেন। মাত্র ১৩ বলের ব্যবধানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে যে দল কয়েক মিনিট আগেও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করছিল, সেই দলই হঠাৎ চাপে পড়ে গেল। স্কোরবোর্ডে ১২০ থেকে ১৪১- এই ২১ রানের পথটাই হয়ে উঠল বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন যাত্রা। অধিনায়ক তৌহিদ হৃদয়, পারভেজ ইমন, নুরুল হাসান সোহান কেউই ইনিংসকে লম্বা করতে পারেননি। আর এখানেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন ইয়াসির আলী ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন।
পরিসংখ্যান বলবে, দু’জনের অবিচ্ছিন্ন জুটি থেকে এসেছে ৪৫ রান। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল তাদের ইনিংসের প্রভাব। কারণ তারা শুধু রান যোগ করেননি, জিম্বাবুয়ের হাতে চলে যাওয়া ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও আবার ফিরিয়ে এনেছেন। বিশেষ করে শেষ ওভারে সাইফউদ্দিনের ব্যাট যেন আগুন ঝরিয়েছে। মাত্র ১০ বলে ৩১ রান- এই ইনিংসটি হয়তো স্কোরকার্ডে খুব বড় দেখাবে না, কিন্তু ম্যাচের প্রেক্ষাপটে সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে মূল্যবান। বিনা উইকেটে ১২০ থেকে পাঁচ উইকেটে ১৪১ হয়ে যাওয়া একটি দলের জন্য এটি ছিল লড়াইয়ে ফেরার স্কোর।
জিম্বাবুয়ের রান তাড়াও শুরু হয়েছিল আত্মবিশ্বাস নিয়ে। প্রথম ওভারেই ১৫ রান তুলে তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল, লড়াই ছেড়ে দেবে না। কিন্তু বাংলাদেশও এবার আগের ম্যাচের মতো ভুল করেনি। শেখ মাহেদী হাসান প্রথম ধাক্কা দেন, নাহিদ রানা যোগ করেন গতি, এরপর আবার মাহেদী। তিন ওভারের মধ্যেই তিন উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। তবু ম্যাচ শেষ হয়ে যায়নি। সিকান্দার রাজা যতক্ষণ ছিলেন, জিম্বাবুয়ের আশা ততক্ষণ বেঁচে ছিল। মাত্র ১২ বলে ২৮ রান করে বাংলাদেশের জন্য বিপদের বার্তা হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দেয়, এবার ম্যাচ হাতছাড়া করতে রাজি নয়।
এরপর দায়িত্ব নেন রিশাদ হোসেন। প্রথম ম্যাচে যে বোলিং ইউনিট প্রশ্নের মুখে ছিল, সেই ইউনিটের নেতৃত্ব দেন তরুণ এই লেগ স্পিনার। চার উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। অন্য দিকে শেখ মাহেদীর তিন উইকেট পাওয়ারপ্লেতেই ম্যাচ বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে আসে। শেষ দিকে সাইফউদ্দিনও ব্যাটের পর বল হাতে নিজের অবদান রাখেন।
এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল দলের প্রতিক্রিয়া। প্রথম ম্যাচে চাপের মুখে ভেঙে পড়া বাংলাদেশ এবার চাপের মধ্যেই নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলেছে। ওপেনিং জুটি পথ দেখিয়েছে, মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা ঢেকে দিয়েছেন লোয়ার অর্ডারের ব্যাটাররা, আর বোলাররা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। একটি ম্যাচ অনেক সময় শুধু জয়-পরাজয়ের গল্প বলে না। সেটি বলে চরিত্রের গল্পও। বুলাওয়ের এই ম্যাচে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, ধস নামলেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়, ম্যাচ হাতছাড়া হতে থাকলেও আবার নিজের দিকে টেনে আনা যায়। আর সেই কারণেই ৩৪ রানের এই জয় শুধু সিরিজে সমতা ফেরানোর জয় নয়; এটি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জয়ও।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ : ২০ ওভারে ১৮৬/৫ (সাইফ হাসান ৫৫, তানজিদ ৫৮, হৃদয় ৬, পারভেজ ১, ইয়াসির ২২*, সোহান ৪, সাইফ উদ্দিন ৩১*; এনগারাভা ২/২৩, রাজা ১/২০, ইভান্স ২/৬৫)।
জিম্বাবুয়ে : ১৯.৪ ওভারে ১৫২ (বেনেট ১১, মারুমানি ৪, মায়ার্স ৪, শুম্বা ১৯, রাজা ২৮, বার্ল ২৯, মাডান্ডে ১, মুসেকিউয়া ১১, ইভান্স ২৫, এনগারাভা ১৫* মুজারাবানি ০; শেখ মাহেদী ৩/২৪, নাহিদ ১/১৫, সাইফ উদ্দিন ১/৩৬, রিশাদ ৪/২৬, সাইফ হাসান ১/৪)।
ফল : বাংলাদেশ ৩৪ রানে জয়ী।
সিরিজ : তিন ম্যাচ সিরিজে ১-১ সমতা।
ম্যাচ সেরা : মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন।



