টাইগার পেস বোলিংয়ে সোনালি প্রজন্ম

Printed Edition

আশিকুর রহমান

বাংলাদেশ ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এ সূচনাকে এখন দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বিশ্বের সেরা পেস আক্রমণগুলোর একটি বলা যেত না। কিন্তু এরপর মাত্র কয়েক বছরেই বদলে গেছে সেই চিত্র। তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম, হাসান মাহমুদ ও নাহিদ রানাদের নিয়ে বাংলাদেশ এখন শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় পেস ইউনিট গড়ে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ে তিন পেসার- হাসান মাহমুদ , তাসকিন আহমেদ ও এবাদত বড় ভূমিকা রেখেছেন।

এই পরিবর্তনের গল্পের শুরু ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টানা ১৩টি ওয়ানডে হেরেছিল বাংলাদেশ। দেশটিতে বাংলাদেশের পেসাররা নিয়েছিলেন মাত্র ৩৭ উইকেট, গড় ছিল ৫৩.৬৭ যা নামিবিয়া, স্কটল্যান্ড, বারমুডা ও কানাডার মতো সহযোগী দেশগুলোর চেয়েও খারাপ।

এর আগে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বাংলাদেশের পেসাররা। এবাদত হোসেনের ৬ উইকেটের পাশাপাশি শরিফুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদও তিনটি করে উইকেট নিয়েছিলেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম ওয়ানডেতেই তাসকিন ও শরিফুল মিলে পাঁচ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে জয় এনে দেন। সিরিজের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৬ রানে কোনো উইকেট না হারিয়ে শুরু করলেও তাসকিনের দুর্দান্ত ৫ উইকেটে ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। তিনি ৩৫ রানে নেন ৫ উইকেট। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ঐতিহাসিক সিরিজ জয় করে। নিউজিল্যান্ডের টেস্ট জয় ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে সিরিজ জয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এগুলোই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের নতুন যুগের সূচনা। ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত ঘরের মাঠ বা জিম্বাবুয়ে ছাড়া বিদেশে কোনো টেস্টে বাংলাদেশের পেসাররা ১০ উইকেট নিতে পারেননি। ২০২২ সালের পর থেকে তারা এমন কীর্তি গড়েছেন ছয়বার।

২০২২ সালের পর তাসকিন, মোস্তাফিজ, শরিফুল, হাসান মাহমুদের পাশাপাশি বাংলাদেশের দ্রুততম বোলার নাহিদ রানার আবির্ভাব এই চিত্র পুরোপুরি বদলে দেয়।

এই পরিবর্তনের পেছনে দূরদর্শী নেতৃত ও পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে মুমিনুল হকের অবদান অনস্বীকার্য। ঘরোয়া লিগে তিনি একাদশে তিন পেসার রাখার ওপর জোর দিতেন। দ্রুত ও বাউন্সি উইকেট তৈরির অনুরোধও করতেন। তার পেস-নির্ভর চিন্তা ছিল ভিন্নধর্মী।

জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও তিনি সেই মানসিকতা ধরে রাখেন।

পাশাপাশি কোর্টনি ওয়ালশ, চার্ল ল্যাঙ্গেভেল্ট ও ওটিস গিবসনের পর অ্যালান ডোনাল্ড বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করেন। তিনি তাসকিন ও মোস্তাফিজের মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি শরিফুল ও হাসান মাহমুদকে গড়ে তোলেন। একই সাথে রেজাউর রহমান রাজা, মুসফিক হাসান ও নাহিদ রানার মতো ভবিষ্যৎ প্রতিভাদেরও চিহ্নিত করেন।

নাহিদ রানার উত্থান ছিল সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মূলত টেনিস বলের ক্রিকেট খেলেছেন। পরে বড় ভাইয়ের পরামর্শে পড়াশোনা শেষ করে ক্রিকেটে পূর্ণ মনোযোগ দেন। প্রথম শ্রেণীর অভিষেকেই ৪ উইকেট নেয়া নাহিদ ২০২২-২৩ মৌসুমে ১৮.২৬ গড়ে ৪১ উইকেট শিকার করেন।

চট্টগ্রামের একটি ফাস্ট-বোলিং ক্যাম্পে অ্যালান ডোনাল্ডের নজরে পড়েন নাহিদ। ২০২৩-২৪ মৌসুমে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিলেট টেস্টে অভিষেকেই পাঁচ উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেন।

২০১৮ সালে দল থেকে ছিটকে পড়া তাসকিনও কঠিন সময় পেরিয়ে ফিরে আসেন জাতীয় দলে। অ্যালান ডোনাল্ড পেসারদের মধ্যে একটি ‘প্যাক মেন্টালিটি’ গড়ে তুলেছিলেন। মুস্তাফিজ ছিলেন দলের প্রথম বড় তারকা পেসার। তার সাথে তাসকিনের প্রত্যাবর্তন এবং নাহিদের উত্থানে গড়ে ওঠে আক্রমণের নতুন ত্রয়ী। টেস্ট ক্রিকেটে তাদের সঙ্গে শরিফুল ও হাসান মাহমুদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০২৬ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও মুমিনুলের পেস-নির্ভর চিন্তা ধরে রাখেন। তাসকিন, মোস্তাফিজ ও নাহিদকে তিনি দলের সেরা বোলিং বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন। তার আস্থার প্রতিদানও দেন পেসাররা। তিন ম্যাচে এই ত্রয়ী ১৯টি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে সিরিজ জেতায়।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও বাংলাদেশের পেসাররা নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেয়। সবুজ উইকেটে খেলার সিদ্ধান্তকে মেহেদী সমর্থন করেন। প্রথম দুই ওয়ানডেতে তাসকিন, মুস্তাফিজ ও নাহিদ মিলে ১৩ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। সিরিজ নিশ্চিত হওয়ার পর নিয়মরক্ষার ম্যাচে শরিফুল ৪৮ রানে ৬ উইকেট নিয়ে পেস আক্রমণের গভীরতা দেখান।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এই পেস আক্রমণের বড় অংশই তরুণ। তাসকিনের ও মোস্তাফিজের রয়েছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। নাহিদ, তানজিম হাসান সাকিব, মুসফিক হাসান ও শরিফুলের বয়স ২৫ বা তার কম। হাসান মাহমুদ ও রেজাউর রহমানও তুলনামূলক তরুণ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চলতি সিরিজের প্রথম টেস্টে ৯ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ। ৯ উইকেট নিয়ে হাসান মাহমুদ ম্যাচসেরা হন। মোট ১৪ উইকেট তুলে নেনে পেসাররা।

বাংলাদেশের পেস আক্রমণ এখনো তাদের পূর্ণ সামর্থ্যে পৌঁছায়নি। সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ। আর সেই নতুন অধ্যায়ের পরবর্তী বড় মঞ্চ হতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকা, যেখান থেকে ২০২২ সালে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের এই নতুন যাত্রা। সূত্র : উইজডেন