বিশেষ সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম মহানগরীর ক্রমবর্ধমান যানজট এবং অপর্যাপ্ত গণপরিবহন শহরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি সঙ্কট। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান ও প্রিলিমিনারি ফিজিবিলিটি স্টাডি অব আরবান মেট্রোরেল ট্রানজিট কন্সট্রাকশন এবং চট্টগ্রাম মনোরেল নেটওয়ার্ক প্রকল্প কার্যকরভাবে এগোচ্ছে। ডিটিসিএ, কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কয়কা) অর্থায়ন এবং ইউশিন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, টেসো ও কুনহয়া কনসোর্টিয়ামের কারিগরি সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে সমন্বিত, টেকসই ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা।
চট্টগ্রামের এমআরটি ও মনোরেল নেটওয়ার্ক একসাথে শহরের জট, পরিবহন সঙ্কট এবং নগর উন্নয়ন বাধা মোকাবেলায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে এমআরটি হলো দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিবহন চাহিদা আর মনোরেল সঙ্কীর্ণ রাস্তা ও নদী সংযোগে দ্রুত, কার্যকর এবং পর্যায়ক্রমিক সমাধান নিয়ে আসবে। প্রকল্পের স্টেকহোল্ডার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এর মতে, ‘এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, কার্যকর ও টেকসই করবে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য মেট্রোরেল ও মনোরেল নেটওয়ার্ক প্রকল্প সমন্বিত, টেকসই এবং আন্তর্জাতিক মানে গ্রহণযোগ্য হবে। ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হলে নগরীর যানজট, সময় ও অর্থ সাশ্রয় নিশ্চিত হবে। পিপিপি মডেল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।
এ উদ্যোগের মূলে রয়েছে চট্টগ্রামের যানজট ২০-৩০% কমানোর লক্ষ্য; মেট্রোরেল লাইনের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই; ৫৪.৫ কিমি মনোরেল নেটওয়ার্কের প্রাথমিক পরিকল্পনা; পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলে তা বাস্তবায়ন এবং স্টেশনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
মেট্রোরেল মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ২০৪২ সাল নাগাদ চট্টগ্রামের জন্য একটি টেকসই, সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি; এমআরটি লাইনের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বিদ্যমান বাস, বিআরটি, রিকশা ও সাইকেল নেটওয়ার্কের সাথে সমন্বয়।
প্রকল্পটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে একনেক অনুমোদন লাভ করে; ২০ মার্চ ২০২৩ প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়। ৫ জুন ২০২৩ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হয়; ১২ জুন ২০২৪ ইনসেপশন রিপোর্ট অনুমোদন হয়; ১ সেপ্টেম্বর- ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ সার্ভে কার্যক্রম হয়; ১০ নভেম্বর ২০২৫ চূড়ান্ত সার্ভে প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।
এ ক্ষেত্রে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০২৬ ইন্টারিম ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রস্তাব রয়েছে। সার্ভে ও ডেটা সংগ্রহ কার্যক্রমের আওতায় স্থানীয় ট্রাফিক, যাত্রী চাহিদা, অবকাঠামোর মান যাচাইয়ের কাজ হয়েছে। জরিপ রিপোর্টের খসড়া হয় ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে; চূড়ান্ত সার্ভে রিপোর্ট হয় ১০ নভেম্বর ২০২৫; আরজিওটেকনিক্যাল, পরিবেশগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সার্ভে প্রস্তুতি চলমান রয়েছে।
স্থানীয় এক ট্রাফিক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, ‘ডিটিসিএর সাথে সমন্বয় প্রক্রিয়া শহরের নাগরিক ও শিল্প মালিকদের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর পরিকল্পনা গড়ার পথ দেখাচ্ছে।’
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম ও কৌশলের মধ্যে রয়েছে : মাস্টার-প্ল্যান প্রণয়ন এর আওতায়- বাস, বিআরটি ও এমআরটি সমন্বয়; সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও মাল্টিমোডাল সমন্বয়। বিদ্যমান পরিবহন পুনর্গঠনের আওতায় রয়েছে-বাস সার্ভিস নেটওয়ার্কের পুনর্গঠন ও আরবান রেলওয়ে উন্নয়ন ও মাল্টিমোডাল সমন্বয় কৌশল।
এ ছাড়া সমন্বিত পরিবহন কৌশল এর আওতায় রয়েছে- রিকশা, সাইকেল ও পথচারীর সুবিধা; ফ্রেইট ও জলপথ ব্যবস্থাপনা। প্রযুক্তি ও টিওডি কৌশল এর আওতায় রয়েছে- আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার; স্টেশনকেন্দ্রিক উন্নয়ন। অর্থায়ন ও নীতিগত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে- আন্তর্জাতিক মানের অর্থায়ন ও নীতিগত এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্কারের প্রস্তাবনা।
এমআরটি প্রাক-সম্ভাব্যতা স্টাডি হবে, রুট নির্বাচন ও চাহিদা বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত ও নির্মাণ সমতা যাচাই নিয়ে।
প্রকল্পের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জে রয়েছে- ইন্টারিম ১ রিপোর্ট (মাস্টার-প্ল্যান) পর্যালোচনাধীন। ইন্টারিম ২ রিপোর্ট (এমআরটি প্রাক-সম্ভাব্যতা) অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রক্রিয়াকরণ। স্টেকহোল্ডার মতামত সংগ্রহ ও সমন্বয় চলমান। সার্ভে ও প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জিওটেকনিক্যাল, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রম প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। এ সংক্রান্ত সুপারিশে ইন্টারিম ১ রিপোর্ট চূড়ান্তকরণ; এমআরটি প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ত্বরান্বিতকরণ; স্টেকহোল্ডার সম্পৃক্ততা জোরদারকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানে চূড়ান্ত প্রাক-সম্ভাব্যতা রিপোর্ট প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মনোরেল নেটওয়ার্কের প্রাথমিক ধারণা অনুসারে, প্রস্তাবনার ভিত্তি হলো- নগর স্থাপত্য, জনসংখ্যা ঘনত্ব ও যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় মনোরেল প্রযুক্তি কার্যকর। সঙ্কীর্ণ রাস্তা ও নদী সংযোগে ন্যূনতম জমি অধিগ্রহণ। এ নেটওয়ার্কের সারসংপে অনুসারে- এর মোট দৈর্ঘ্য: ৫৪.৫ কিমি; লাইন: ৩টি প্রধান করিডোর ও ১ সংযোগ লিংক; স্টেশন: ৩৪টি; ব্যয়: কমবেশি ২,৩১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বাস্তবায়নকাল হবে ৫-৬ বছর।
প্রকল্পের ১ নং কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর ২৬.৫ কিমি রুট দক্ষিণাঞ্চলের আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র সংযোগ এবং বিমানযাত্রী সুবিধা নিশ্চিত করবে। ২ নং সিটি গেট থেকে শহীদ বশিরুজ্জামান স্কয়ার পর্যন্ত ১৩.৫ কিমি রুট ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক জেলা ও সদরঘাট নদীবন্দর সংযোগ করবে। ৩ নং বাংলাদেশ অক্সিজেন থেকে ফিরিঙ্গীবাজার ১৪.৫ কিমি রুট শিল্প এলাকা থেকে কেন্দ্রে শ্রমিক যাতায়াত এবং মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকায় বিকল্প পরিবহন সুবিধা তৈরি করবে। সংযোগ লিংক হবে পাঁচলাইশ থেকে এ.মকে. খান বাস স্টপ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত নেটওয়ার্কের সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে। নেটওয়ার্কের প্রধান ডিপো হবে কালুরঘাটে আর স্যাটেলাইট ডিপো: লাইন ২ ও ৩ এর দক্ষ অপারেশন নিশ্চিত করবে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন মডেল অনুসারে নকশা ও সমীক্ষা হবে ৬ থেকে ১২ মাস এর মধ্যে, কাঠামোগত নির্মাণে সময় লাগবে ২৪ থেকে ৩৬ মাস; সিস্টেম, রোলিং স্টক ও ডিপো নির্মাণে সময় যাবে-১৮ থেকে ২৪ মাস; পরীক্ষা ও বাণিজ্যিক চালুতে সময় লাগবে ৬ থেকে ১২ মাস। পিপিপি মডেল : বিওটি হবে ৩০ বছরের চুক্তি। চুক্তি শেষে সরকারি সংস্থায় হস্তান্তর হবে প্রকল্পটি।
প্রকল্পের প্রত্যাশিত আউটপুট হলো- যানজট ২০-৩০% কমানো; স্টেশনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন ও জমির মূল্য বৃদ্ধি; নগর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব এবং বহুমুখী যাত্রী চাহিদা পূরণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর জনসাধারণ এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হবে, যা নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে মডার্ন, সাশ্রয়ী এবং নাগরিক-বান্ধব করে গড়ে তুলবে।



