নিজস্ব প্রতিবেদক
সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে পৃথক ও স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া রায় স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করে এই আদেশ দেন। একই সাথে আগামী ১৬ জুন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এই মামলার মূল আপিল শুনানির জন্য ১ নম্বর কার্যতালিকাভুক্ত (আইটেম) হিসেবে দিন ধার্য করা হয়েছে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত থাকবে।
এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাসহ সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিদ্যমান বিধান এবং ২০১৭ সালের বিচার বিভাগীয় শৃঙ্খলা বিধিমালা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল ওই রায়ের ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষ গত ২১ মে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে স্থগিতাদেশের আবেদন জানায়। চেম্বার আদালত আবেদনটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠানোর পর গতকাল মঙ্গলবার আপিল বিভাগে এর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
আদেশের পর সুপ্রিম কোর্ট অ্যানেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল হাইকোর্টের রায় স্থগিত চাওয়ার পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায়টি যদি এই মুহূর্তে স্থগিত করা না হতো, তবে আমাদের বিচার বিভাগীয় প্রশাসনে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা ও বড় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতো। কারণ যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় করা হয়েছিল, নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি অধিকতর যাচাই-বাছাই ও সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শের প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে রহিত করেছে। আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদেরই। স্বার্থ সুরক্ষার স্বার্থেই পার্লামেন্টে এই রহিতকরণ বিল আনা হয় এবং গত ৯ এপ্রিল ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘রহিতকরণের ওই আইন পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় তার আইনি ভিত্তি হারিয়েছে। এর ফলে বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম আবার পুরনো কাঠামোয়, অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে গেছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ মে সেখানে কর্মরত ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেয়া হয়েছে। সরকার আইনটি পুরোপুরি বাতিলের পক্ষে নয়, বরং অধিকতর যাচাই-বাছাই করতে চায় এবং আদালতের সামনে আমি সরকারের সেই অবস্থানই ব্যাখ্যা করেছি।
অন্য দিকে, রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সরকারের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘আদালত অবমাননাকর’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগের স্পষ্ট ডাইরেকশন থাকা সত্ত্বেও আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে সচিবালয় ভেঙে ফেলা এবং কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়ার সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি মোটেও ভালো ছিল না। এটি এক ধরনের আদালত অবমাননাকর কাজ। স্থগিতাদেশের পিটিশনটি আপিল বিভাগে মঞ্জুর হবে কি হবে না, এতটুকু ধৈর্য সরকারের ধারণ করা দরকার ছিল। সরকারের এই অধৈর্যতা দেশের মানুষের কাছে উচ্চ আদালত ও বিচার বিভাগের প্রতি নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে এবং একটি খারাপ নজির তৈরি করেছে যে আদালতের রায় না মানলেও মনে হয় চলে।’
আপিল বিভাগে শুনানিতে নিজেদের আইনি যুক্তি উল্লেখ করে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘আমরা আজ আদালতে আংশিক বক্তব্য রেখেছি। এই সচিবালয় স্থাপনের আদেশটি মূলত উভয় পক্ষের পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের দেওয়ানি কার্যবিধি আইনের ৯৬ ধারা অনুযায়ী, ঐকমত্যের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তার বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা যায় না। তার পরেও সরকার পক্ষ আপিল করেছে এবং আগামী ১৬ জুনের পূর্ণাঙ্গ শুনানিতে আমরা এই প্রশ্নটি দৃঢ়ভাবে উত্থাপন করব।’ অধস্তন আদালতের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকলে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, যা বিগত বছরগুলো আমাদেরকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বিচার বিভাগ আইন মেনে চলবে, আমরা কোনো ‘মনস্টার’ বা দানবীয় বিচার বিভাগের পক্ষে নই। আমরা চাই বিচারকদের আচরণবিধি থাকবে, জবাবদিহিতা থাকবে, কিন্তু স্বাধীনভাবে ভালো বিচার করার জন্য তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অবশ্যই দরকার।’
প্রধান বিচারপতির এই আপিল শোনা ‘স্বার্থের সংঘাত’ কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘এখানে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ নেই, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ব্যাপার। এই প্রশ্নের আইনি মীমাংসা ১৬তম সংশোধনীর মামলাতেই হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেয়ার আইনটি যখন সুপ্রিম কোর্টে বিচার হয়েছিল, তখনও তৎকালীন বিচারকরাই এর শুনানি করেছিলেন। কারণ এগুলো কোনো ব্যক্তি বিশেষের একক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবীর পক্ষে মোহাম্মদ শিশির মনির ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ (যেখানে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল) পুনর্বহালের নির্দেশনা চেয়ে এই রিট পিটিশনটি দায়ের করেছিলেন। বর্তমান সংশোধিত ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত, যা সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক প্রয়োগ করা হয়।



