মিডলইস্ট মনিটর
ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত নির্মমতায় গত জুলাই মাসজুড়ে রক্তে ভেসেছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা। পুরো গাজায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৫২ জন ফিলিস্তিনি, যা চলতি বছরের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড। ইসরাইলের এ চরম অমানবিক হামলা এবং যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে অবমাননা করার কারণে নিরীহ সাধারণ মানুষকে এভাবে জীবন দিতে হচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য ও স্বাস্থ্য তথ্যকেন্দ্রের জরিপে রক্তক্ষয়ী এই চিত্র উঠে এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, নিহতের তালিকায় রয়েছেন অন্তত ২১ জন শিশু, ১৪ জন নারী এবং চারজন প্রবীণ নাগরিক। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা এবং আশ্রয়শিবিরে ইসরাইলের সরাসরি হামলায় তাদের এই করুণ পরিণতি হয়েছে। এমনকি গত ২৯ জুলাই খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তাঁবু লক্ষ্য করে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান দু’জন সাধারণ মানুষ। বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত আহতদের যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে নাসের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন চারপাশের হাহাকার আর কান্নায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ইসরাইল ক্রমাগত সেই শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে আসছে। চুক্তি নামকাওয়াস্তে থাকলেও ইসরাইলি বাহিনীর তাণ্ডব থামেনি। এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা এক হাজার ২৩০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং আহত করেছে আরো চার হাজার ৭৬ জনকে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হাজার ৩৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও এক লাখ ৭৪ হাজার ১৮৫ জন আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।
মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ধ্বংসলীলার চূড়ান্ত রূপ দেখেছে গাজা। ইসরাইলি সামরিক অভিযানে অবরুদ্ধ এ উপত্যকার বেসামরিক সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশই মাটির সাথে মিশে গেছে। হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর কিংবা যোগাযোগের পথ- সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের একটি হিসাব অনুযায়ী, বিধ্বস্ত গাজাকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে বা পুনর্নির্মাণ করতে প্রায় সাত হাজার কোটি (৭০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে।
সর্বশেষ হামলায় নিহত আরো ৮
গাজায় যুদ্ধবিরতি ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে নতুন মার্কিন উদ্যোগের মধ্যেই গাজা উপত্যকায় আবারো বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সর্বশেষ হামলায় অন্তত আট ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার সিভিল ডিফেন্স। খবর আলজাজিরার।
গতকাল রোববার গাজার বিভিন্ন এলাকায় চালানো এসব হামলায় নিহতদের মধ্যে দেইর আল-বালাহর দক্ষিণে একটি আবাসিক ভবনে ইসরাইলি হেলিকপ্টারের হামলায় এক নারী ও এক পুরুষ রয়েছেন। এ ছাড়া খান ইউনুসে পৃথক হামলায় তিনজন এবং গাজা সিটির পুরনো এলাকায় আরো একজন নিহত হন। তবে সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নিহতের এই সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। এই হামলা এমন সময় হলো, যখন দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ গাজায় গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৫ দফা একটি রোডম্যাপ প্রকাশ করে। এতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ধাপে ধাপে ইসরাইলি বাহিনীর গাজা থেকে প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়।
তবে এখন পর্যন্ত ওই পরিকল্পনার কোনো অংশই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি। হামাস জানিয়েছে, ইসরাইল সামরিক অভিযান বন্ধ করে গত বছরের চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার করলেই তারা অস্ত্র সংরক্ষণের জন্য হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। অন্য দিকে ইসরাইলের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, হামাসের ‘প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ’ না হলে বর্তমান অবস্থান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
এ দিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে দেশটির কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই পরিকল্পাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে হামাসের নেতাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত ফাতাহর সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ দাহলান দাবি করেছেন, ট্রাম্পের জামাতা ও মার্কিন উদ্যোগের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার তাকে জানিয়েছেন, গাজায় হামলা বন্ধে ইসরাইলের সাথে কাজ চলছে। দাহলানের ভাষ্য, ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে ইসরাইল প্রতিদিনের হামলা পুরোপুরি বন্ধ করে কি না তার ওপর।



