পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদদাতা
একদিকে সাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ, অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বরগুনার পাথরঘাটাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় অর্ধলাখ জেলেপরিবার চরম দুর্দশায় পড়েছে। ট্রলার মালিক ও আড়তদারদের কাছ থেকে নেয়া দাদনের ঋণ, এনজিওর কিস্তি এবং ক্রমাগত লোকসানের চাপে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। এর প্রভাব পড়ছে তাদের সন্তানদের জীবনেও। অভাবের কারণে অনেক শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে বাবার সাথে সাগরে বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত হচ্ছে।
পাথরঘাটার স্থানীয় জেলেরা জানায়, প্রতিবার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে ট্রলারের জ্বালানি, বরফ, খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য রসদ কিনতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এই অর্থের বড় অংশই ট্রলার মালিক বা আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু কয়েক মাস ধরে সাগরে কাক্সিক্ষত মাছ না পাওয়ায় অধিকাংশ ট্রলারই প্রায় খালি হাতে ঘাটে ফিরছে। শুরুতেই ট্রলার মালিক মাছ বিক্রির অর্থ থেকে দাদনের টাকা কেটে নিচ্ছেন। তখন আর জেলেদের হাতে থাকছে না সংসার চালানোর মতো অর্থ।
জেলে মনির, আলম মাঝি ও সাইকুল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, সাগরে পর্যাপ্ত মাছ না থাকায় দাদনের ঋণ শোধ তো দূরের কথা, এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করাও তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। প্রতিনিয়ত কিস্তির চাপ, ধারদেনা এবং সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।
জেলেদের ভাষ্য, এই সঙ্কটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে জেলে পরিবারের শিশুরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ই যেখানে মেটানো কঠিন, সেখানে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করা জেলে পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠছে। ফলে পরিবারগুলোর শত শত শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। অনেকেই জীবিকার তাগিদে বাবার সাথে মাছ ধরতে যাচ্ছে কিংবা অন্য শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সঙ্কটে রয়েছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও। তাদের দাবি, বৈরী আবহাওয়া ও ঘন ঘন নিম্নচাপের কারণে জেলেরা নিয়মিত সাগরে যেতে পারছেন না। আবার সাগরে গেলেও আগের মতো মাছ মিলছে না। এতে প্রতিটি ট্রলারে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বরগুনা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নিরাপদে মাছ ধরতে পারছেন না। অন্যদিকে মাছের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাচ্ছে। এতে ট্রলার মালিক ও জেলে- উভয় পক্ষই আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে।
গোলাম মোস্তফা আরো বলেন, উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠী ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত বিশেষ প্রণোদনা, আপদকালীন খাদ্যসহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে উপকূলের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যশিল্প বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়বে।



