বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে পরিণত করতে কাজ করছে সরকার। বাংলাদেশ এখন শুধু লজিস্টিকস ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নয়, পুঁজিবাজারসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশ্বের জন্য নিজেদের দ্বার আরো উন্মুক্ত করছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং এটি বাংলাদেশের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গতকাল রোববার চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ার চরে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার গ্রাউন্ড ব্রেকিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রোমেশ ডেভিড, এপিএম টার্মিনালস বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লিমেন্টেশন জ্যাক ক্রেগ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার এবং এপি মোলার সিঙ্গাপুরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেনে পিল পেডারসেন বক্তব্য রাখেন।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আধুনিক বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের আরো কয়েকটি বৃহৎ বন্দর, লজিস্টিকস সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে সরকার আলোচনা ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। সরকারের কাজ ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং বেসরকারি খাতকে ব্যবসা পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যেই সরকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের জন্য উন্নতমানের লজিস্টিকস ব্যবস্থা, কার্যকর বাণিজ্য সুবিধা, সময়োপযোগী বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগবান্ধব প্রণোদনা এবং সরকারের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। এই প্রকল্পের যাত্রা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
আমির খসরু মাহমুদ নর্ডিক দেশগুলোর মানবিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার প্রশংসা করে বলেন, বিশ্বব্যাপী একটি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির সাথে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে। দেশের লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের সাথেও বাংলাদেশের সংযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপক এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের সাথে কাজ করছে সরকার। বৈদেশিক বাজারে ডলার বন্ড ছাড়ার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
সম্মানিত অতিথির বক্তৃতায় নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার উদ্যোগ চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রসার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। তিনি বলেন, আজকের দিনটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং টার্মিনাল হ্যান্ডলিংয়ের সর্বাধুনিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। নৌপরিবহন মন্ত্রী আরো বলেন, ডেনমার্কের এপি মোলার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের মাধ্যমে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বিনিয়োগ আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টার্মিনালটি বছরে প্রায় আট লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন করবে। তিনি বলেন, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ডিকার্বনাইজেশনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়টিও প্রকল্পটিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।



