নিজস্ব প্রতিবেদক
‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম ২০২৬’-এর আওতায় দেশের এক হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বই নির্বাচন ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সৃজনশীল বই প্রকাশক সমিতি, ঢাকা।
রোববার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, শিশু-কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের সাথে তাদের পরিচিত করার এ উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানায়। তবে কর্মসূচির বই নির্বাচন ও ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশনা অঙ্গনে যেসব প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রকাশক সমিতির অভিযোগ, নির্বাচিত বইয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, বই নির্বাচনের নীতিমালা ও মানদণ্ড, নির্বাচন কমিটি বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পরিচয়, প্রকাশকদের কাছ থেকে বই আহ্বানের পদ্ধতি এবং বইয়ের ক্রয়মূল্য ও পরিমাণ সম্পর্কে এখনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সংগঠনটির মতে, সরকারি অর্থে পরিচালিত কর্মসূচিতে জনগণের অর্থে কেনা বইয়ের তালিকা, লেখক, প্রকাশক, সংস্করণ, ক্রয়সংখ্যা ও মূল্য জনসমক্ষে থাকা উচিত।
নির্দিষ্ট প্রকাশক নিয়ে প্রশ্ন : প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকাশনা অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশকের একাধিক বই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই সাথে কিছু প্রকাশকের বই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সংগঠনটি জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে তারা প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করছে না। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে তারা।
প্রকাশক সমিতি বলেছে, কোনো লেখক বা প্রকাশকের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বই অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। বইয়ের মান, বিষয়বস্তু, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, বয়সোপযোগিতা, ভাষা, সম্পাদনা, মুদ্রণমান ও শিক্ষার্থীদের উপযোগিতাকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রধান মানদণ্ড করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
‘সূর্য সেন’ বইয়ের স্বত্ব নিয়ে প্রশ্ন : কর্মসূচির বই তালিকায় থাকা ‘সূর্য সেন’ বিষয়ক একটি বই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রকাশক সমিতি।
সংগঠনটির দাবি, বইটির লেখক পশ্চিমবঙ্গের এবং মূল প্রকাশকও পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। পরে বইটি বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছে। বাংলাদেশে বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে মূল স্বত্বাধিকারী বা প্রকাশকের কাছ থেকে যথাযথ অনুমতি নেয়া হয়েছে কিনা, পুনঃপ্রকাশের বৈধ চুক্তি রয়েছে কি না এবং রয়্যালটি বা স্বত্ব বাবদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে তারা।
তাদের মতে, বিদেশী কোনো বই যথাযথ স্বত্ব ও অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে প্রকাশ করা হলে আপত্তির কারণ নেই। তবে অনুমতিহীন পুনর্মুদ্রণ বা পুনঃপ্রকাশের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি অর্থে এমন বই কেনা হয়ে থাকলে বিষয়টি আরো গুরুত্বের সাথে যাচাই করা উচিত।
প্রকাশক সমিতি আরো জানতে চেয়েছে, সূর্য সেনকে নিয়ে বাংলাদেশের লেখকদের প্রকাশিত বই এ ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না।
বিদেশী বইয়ের স্বত্ব যাচাইয়ের দাবি : কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে বিদেশী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বইয়ের সাথে বাংলাদেশের সংস্করণের মিল রয়েছে এবং যথাযথ প্রকাশনা-স্বত্ব নেয়া হয়েছে কি না এমন প্রশ্নও উঠেছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করেই নির্ধারণ করা সম্ভব উল্লেখ করে সংগঠনটি অভিযোগ অস্বীকার বা পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদের স্বত্ব-সংক্রান্ত নথি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
‘দেশীয় প্রকাশকদের সমান সুযোগ দিতে হবে’ : প্রকাশক সমিতি বলেছে, কর্মসূচিতে বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রকাশকদের কাছ থেকে বই আহ্বান করা হলে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, নির্ধারিত মানদণ্ড এবং সব প্রকাশককে সমান সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সাথে নির্বাচিত বইয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
সংগঠনটির দাবি- ভালো বইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত নেই। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্য ও ইতিহাসের বই শিশু-কিশোরদের পাঠের অংশ হতে পারে। তবে বাংলাদেশের শিশুদের জন্য সরকারি অর্থে বৃহৎ পরিসরের বইপড়া কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় দেশীয় লেখক ও প্রকাশকদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিতুমীর, হাজী শরিয়তউল্লাহসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও আন্দোলনগুলো শিশু-কিশোরদের পাঠ্যসূচিতে যথাযথভাবে তুলে ধরার বিষয়টিও বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
১০ দফা দাবি : বই নির্বাচন ও ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে সৃজনশীল বই প্রকাশক সমিতি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচিত ও ক্রয়কৃত সব বইয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, প্রতিটি বইয়ের লেখক ও প্রকাশকের নাম, সংস্করণ, মুদ্রণসংখ্যা, ক্রয়কৃত কপির সংখ্যা ও মূল্য প্রকাশ, বই নির্বাচন ও ক্রয়ের নীতিমালা ও মানদণ্ড জনসম্মক্ষে প্রকাশ এবং নির্বাচন কমিটি বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যদের নাম, যোগ্যতা ও দায়িত্ব প্রকাশ।
এ ছাড়া প্রকাশকদের কাছ থেকে বই আহ্বান করা হলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি, জমা পড়া বইয়ের সংখ্যা ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিদেশী লেখক বা প্রকাশকের বই বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট বইয়ের বৈধ প্রকাশনাস্বত্ব, অনুমতিপত্র ও চুক্তি যাচাই ও প্রকাশ এবং অনুমতি ছাড়া কোনো বই পুনঃপ্রকাশিত বা মুদ্রিত হয়েছে কিনা তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবিও রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে বই নির্বাচন না করা এবং কোনো লেখক বা প্রকাশক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবিও জানিয়েছে তারা।
ভবিষ্যতে সরকারি বা সরকারি অর্থায়নে বই কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানানো হয়েছে। প্রকাশক সমিতি বলেছে, তারা বইপড়া কর্মসূচির বিরোধী নয় বরং শিশু-কিশোরদের হাতে আরো বেশি মানসম্মত বই পৌঁছে দেয়ার জন্য এ ধরনের কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পক্ষে। তাদের ভাষায়, “আপত্তি বই কেনায় নয়; আপত্তি অস্বচ্ছতায়।”
সংগঠনটি আশা করছে, সরকার ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে দ্রুত নির্বাচিত বইয়ের তালিকা ও ক্রয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করবে। এতে বর্তমান বিতর্কের অবসানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সরকারি বই ক্রয় প্রক্রিয়ায়ও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।



